৮:০৪ এএম, ৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার | | ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১




মানুষকে ভালবাসতে শিখলেই জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


হেলাল হাফিজ।  বাংলা ভাষার এমন এক আধুনিক কবির নাম যিনি স্বল্পপ্রজ হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।  তার একটি মাত্র মৌলিক কাব্যগ্রন্থ – ‘যে জলে আগুন জ্বলে’।  এখন পর্যন্ত এটাই বাংলা কবিতার বেস্ট সেলার বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।  ১৯৮৬ সালে এই বইটি প্রকাশের পর অসংখ্য সংস্করণ হয়েছে।  ২৫টি সংস্করণ প্রকাশিত হলেও এরপর গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে তার নিস্পৃহতা দেখা যায়।  ২৬ বছর পর ২০১২ সালে আসে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’।  তিনি সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতেও দায়িত্ব পালন করেছেন। 

 

হেলাল হাফিজ কষ্টের ফেরিওয়ালা।  অথচ তার কাছে হরেক রকম কষ্ট খুঁজতে গিয়ে, ফিরে আসতে হয় এক বুক ভালোবাসা নিয়ে।  বাংলা কবিতায় তিনি তাই কবিতার এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা।  তিনি বিশ্বাস করেন- প্রেমের কোনো বিকল্প নেই, দেশ-সমাজ তথা সারা বিশ্বের সকল অস্থিরতা, ভেদাভেদ একমাত্র মানবপ্রেমের মাধ্যমেই ভুলিয়ে দেওয়া সম্ভব।  জনপ্রিয় এ কবির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিফাত বিনতে ওয়াহিদ।  পড়ুন প্রথম পর্ব-

কেমন আছেন কবি? অনেকদিন অসুস্থতায় ভুগছেন, শরীর কেমন এখন?
শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে।  শারিরীকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছি।  এখন খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাই। 

নিয়মিত ডাক্তার দেখাচ্ছেন কী?
আমার আসলে এখন আর ডাক্তারের কাছে যেতে ভাল লাগে না।  চোখের জন্য চার-পাঁচবার ডাক্তার দেখিয়েছি।  শরীরে অন্যান্য সমস্যা রয়েছে সেটার জন্য যাওয়া হয়নি, যেতে ইচ্ছেও করে না।  যতদিন আছি, এভাবেই কেটে যাবে। 

আপনার চোখের সমস্যাটা তো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে বলে শুনেছি, ডাক্তার কী বলেন?
ডাক্তার আমাকে বেশ বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন বাম চোখটায় আর কোনোদিন আমি দেখতে পাব না।  অর্থাৎ সেটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।  ডান চোখটা ৮২ থেকে ৮৫ শতাংশ ভাল আছে।  সেটি যেন বাঁচিয়ে রাখা যায় সেই চেষ্টাটাই তিনি করছেন।  আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দেশের বাইরে কী বাম চোখটা সারানো সম্ভব? তিনি বলেছেন সম্ভবত কোথাও সেটা সম্ভব নয়।  তবুও যদি আমি ক্রস চেক করতে চাই তবে চেন্নাই- এর শঙ্কর নেত্রালয়ে একবার দেখাতে পারি। 

আপনি কী সেখানে দেখাবেন ভাবছেন?
না।  এখন শরীরের যে অবস্থা, তাতে এত টানা হেচড়ার ধকল পোহাতে পারব না। 

নিজের প্রতি এই অবহেলা কী আত্মপীড়নের অংশ?
আত্মপীড়নে সবাই ভুগে, তুইও নিশ্চয় ভুগিস? আমি একা ভুগব কেন? শরীরটা এখন আর আগের মতো চলে না, তাই কোথাও যেতে আমার ভাল লাগে না।  সারাদিন প্রেস ক্লাবেই কাটিয়ে দেই, শুধুমাত্র রাতে গিয়ে হোটেলে ঘুমাই। 

হোটেলে তো বহুবছর যাবৎ রয়েছেন? এই যে একা জীবন, একাকিত্ব গ্রাস করে না?
পাঁচ বছর হয়ে গেল আমার হোটেল জীবন।  একা যে লাগে না তা না, দিনটা তাই কোনোমতে কাটিয়ে দেই ক্লাবে।  এখানে তো সব সময় পরিচিত মানুষের দেখা মিলে।  তাদের সঙ্গে কথা হয়।  মধ্য যৌবন পর্যন্ত এই অভাববোধ অনুভূত হয়নি।  বয়স যত বাড়ছে একাকিত্ব ততই গ্রাস করছে। 

হোটেলে কেন? আপনার তো একজন বড় ভাই আছেন, তার কাছে কিংবা অন্য কারোর সঙ্গে থাকা যায় না?
নিজেকে কারোর বোঝা বানাতে ভালো লাগে না।  আমার ভাই অথবা অন্য আত্মীয়রা বহুবার চেয়েছেন তাদের কাছে গিয়ে থাকি, পাঁচ বছর হল আমি এই একাকী জীবন বেছে নিয়েছি, এখন তারাও এটাকে মেনে নিয়েছেন। 

আপনার ভেতর এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লক্ষ করা যায়, এটার উৎস কী?
খুব ছোটবেলায় আমাদের দুই ভাইকে রেখে মা মারা যান।  আমার বয়স তখন তিন।  মাকে দেখেছিলাম কিন্তু মায়ের কোনো স্মৃতি মনে ছিল না।  নানা-নানির মুখেই শুনেছি তিনি বেশ রূপসী ছিলেন।  খুব যৌক্তিক কারণেই মা মারা যাওয়ার চার বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেন।  মা না থাকলে সন্তানের অবস্থা কী হয় সেটা তো সবাই জানে।  যতই অন্য আত্মীয়-স্বজন থাকুক না কেন, মায়ের তো আর বিকল্প হয় না।  আস্তে আস্তে যখন কৈশোরে পা ফেললাম, তখন বুঝতে পেরেছি আমার কোনো একটা অভাব আছে।  সে অভাব ভালবাসার, আদরের।  তখন থেকেই এক ধরনের এলোমেলো ভাব চলে আসে।  নিঃসঙ্গ ভাবটাও তখন থেকেই। 

বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী কী আপনাদের মায়ের মতো স্নেহ করতেন?
সৎ মা বলতে আমাদের সমাজে যে দৃশ্য ভেসে উঠে, অতটা প্রকট প্রভাব ছিল না।  কিন্তু এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা সব সময়ই ছিল।  একটাই ধারণা মনে গেঁথে গিয়েছিল যে উনি আমার নিজের আম্মা না।  তার প্রতি ওই বয়সে যে অভিযোগগুলো মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল এখন এই বয়সে এসে মনে হয় সেখানে বোধহয় আমারই ভুল বেশি।  আর তাছাড়া মা তো মা-ই, মায়ের বিকল্প হওয়া কারোর পক্ষেই সম্ভব না। 

তাহলে আপনার বাবার এই দ্বিতীয় বিয়েই কি আপনার জীবনে পরিবর্তন এনেছিল?
এক প্রকার পরিবর্তন তো এনেছিল বটেই।  এ পরিবর্তন আমাকে কিছুটা এলোমেলো করে দিয়েছে।  বলতে পারিস পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যেটা এই বয়সে এসেও আমার মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল। 

এই দুঃখবোধ ভুলতেই কি কবিতায় আশ্রয় নেওয়া?
শৈশবের মানসিক অস্থিরতা থেকেই এক ধরনের একাকিত্ব ছিল, স্কুলে পড়ার সময় সেটা আরও প্রবল হল।  যতটা না বাহ্যিকভাবে, মানসিকভাবে আরো বেশি।  স্কুলজীবন থেকেই আমি খেলাধুলার পাগল ছিলাম।  মানসিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণের জন্য খেলাধুলার প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হলাম।  ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল- যখন যা পেরেছি, খেলছি। 

আমার বাবা ছিলেন নেত্রকোনার ডাকসাইটে শিক্ষক, সে কারণে সবার সঙ্গে মেলামেশার একটা সুযোগ আমার ছিল।  নেত্রকোনা খুব সাংস্কৃতিক প্রবণ এলাকা ছিল।  যার ফলে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে আমার সে বয়স থেকেই একটা যোগাযোগ হয়েছিল।  ক্লাশ এইট-নাইনে উঠে বিভিন্ন কারণে মাতৃহীনতা আমার ভেতরে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল।  একসময় অনুভব করলাম আমার ভেতরের দাহকে, খেলাধুলা প্রশমিত করতে পারছে না।  তখন থেকেই একটু আধকটু ছড়া, দু-একটা দুর্বল পঙক্তি, কোনো বান্ধবীকে নিয়ে দুষ্টুমি করে দু-তিন লাইন লেখা শুরু করি। 

কবিতার বাইরে অন্য একটি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ।  সময় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে অস্থিরতা চলছে, এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
মানুষ মানুষকে ভালবাসতে শিখলেই জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি সম্ভব। 

শনিবার পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব