৬:৫৯ পিএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

পুঁজি সংকট, উত্তরাঞ্চলে ২০ কোটি টাকার চামড়া নষ্টের আশঙ্কা

৩১ আগস্ট ২০১৭, ১১:০১ এএম | এন এ খোকন


এসএনএন২৪.কম : টানা তিন বছর ধরে চামড়ার বকেয়া টাকা দিচ্ছে না ঢাকার পাইকাররা।  এতে  উত্তরাঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রায় ২০ কোটি টাকা পড়ে আছে ঢাকার পাইকারদের কাছে।  ফলে এবার কোরবানির চামড়া কিনতে পুঁজি সংকটে আছে এই অঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ীরা।  এতে আসছে কোরবানিতে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হওয়ার আশংকা করছেন তারা। 

বর্তমানে এই অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক বড় ব্যবসায়ী এখন ঢাকার আড়তে টাকার আশায় বসে আছে।  ঢাকার পাইকাররা বকেয়া টাকা দিতে তাদের সাথে তিন বছর ধরে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ করছেন এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।  তারা বলছেন ঈদের আর মাত্র একদিন বাকি থাকলেও পুঁজি সংকটের কারণে এখনো চামড়া কেনার প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।  ফলে এবার এই অঞ্চলের আশি ভাগ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশংকা করছেন তারা। 

দেশের উল্লেখযোগ্য শিল্পগুলোর মধ্যে চামড়া অন্যতম একটি শিল্প।  দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই চামড়া এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই ব্যবসায় উত্তর জনপদের অনেক মানুষই সংশ্লিষ্ট।  একটা পরিসংখানে দেখা গেছে উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ তাদের জীবিকা খুঁজেন এই ব্যবসায়। 

বগুড়া চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সূত্রে  জানা যায়, নাটোর, পাবনা, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার সাথে বগুড়ার চামড়া ব্যবসার সম্পৃক্ততা আছে।  উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ চামড়া বগুড়ার ব্যবসায়ীরা কিনে থাকেন।  শুধুমাত্র বগুড়া জেলাতেই প্রতিদিন তিন শতাধিক গরু, ছাগল এবং ভেড়ার চামড়া কিনে থাকেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।  উত্তরের সব জেলায় প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ থেকে ৮০০ গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কোরবানি হয়ে থাকে।  কোরবানিকৃত এসব পশুর চামড়া ৩-৪ হাত বদল হয়ে বগুড়ার মহাজনদের হাতে আসে।  এই সব চামড়া কেনার পর লবণ প্রয়োগে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকার হাজারীবাগের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। 

এদিকে ঢাকার হাজারীবাগের টেনারী মালিকরা বলছে তাদের সাভাবে স্থানান্তর করার কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে।  অপরদিকে সরকারি ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও তারা তা পাননি বলে জানাচ্ছেন।  এতে দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা দিতে পারছেন না তারা। 

এদিকে মফস্বলের পাইকাররা বলছে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা তাদের কোটি কোটি টাকা আটকিয়ে ব্যবসা করলেও তা ফেরত দিতে তিন বছর ধরে গড়িমসি করছে। 

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার মেসার্স মুন্না টেডার্সের মালিক চামড়া ব্যবসায়ী  তোজাম্মেল হোসেন ঢাকাটাইমসকে জানান, তিনি ঢাকার ‘মদিনা ট্যানারি’ থেকে তিন বছর আগের পাওনা ৯০ লাখ টাকা এখনো পাননি।  গত বছর চামড়া দিয়েছেন ‘মুক্তা ট্যানারি’ নামের আরেক আড়তে।  তাদের কাছে বর্তমান পাওনা দুই কোটি টাকা।  এক সপ্তাহ ধরে তিনি এসব ট্যানারিগুলোতে অবস্থান করছেন টাকার জন্য।  তারা টাকা দিতে গড়িমসি করছে বলে জানান তিনি। 

এই ব্যবসায়ী আরও জানান, ঢাকার আড়তদাররা যদি ঈদের আগে তাদের পাওনা টাকা পরিষদ না করে তাহলে তারা এলাকায় ফিরতে পারবেন না।  কারণ তাদের কাছেও ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা টাকা পাবে।  এসব ছোট ব্যবসায়ীদের চাপ এবং ব্যাংক ঋণের চাপে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার উপক্রম হয়েছে বলে তিনি জানান।  

এদিকে পুঁজি সংকটে পথে বসেছে গ্রামগঞ্জের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরাও।  গত বছর কোরবানীর চামড়ার টাকা তাদের জেলার মহাজনদের কাছে আটকে থাকায় এবার তারা চামড়া কেনার টাকা পাচ্ছে না।  ফলে সাধারণ মানুষ যারা কোরবানি করবেন তাদের চামড়া কেনার কোনো ব্যবসায়ী থাকবে না।  ফলে সরকার নির্ধারিত দামে কেউ চামড়া বিক্রি করতে পারবেন বলে মনে হয় না। 

বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক বজলুর রহমান ঢাকাটাইমসকে জানান, তিনিও বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।  তিনি ঢাকার ‘মাঠ লেদার’সহ আরও কয়েকটি আড়ৎ থেকে  কোটি ৩৮ লাখ টাকা পাবেন।  ব্যবসার পুঁজির সবটাই ঢাকার ব্যবসায়ীদের হাতে আটকে থাকায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।  তিনি জানান, চামড়া কেনার আগে লবণ এবং লেবার ঠিক করে রাখতে হয়।  ঈদের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকলেও তিনি লবণ এবং লেবার প্রস্তুত করতে পারেনি।  তার বক্তব্য টাকা না পেলে চামড়া কিনতে পারবো না নেবার লবণ দিয়ে কী হবে। 

তিনি আরও জানান, এসব টাকার বেশির ভাগ গ্রামগঞ্জের ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের টাকা।  তাদের কাছ থেকে বাকিতে চামড়া কিনে ঢাকায় দিয়েছি।  এখন থেকে টাকা না দিলে এলাকায় ফিরতে পারবো।  এতে অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

এবার সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে গাই গরুর চামড়া বিক্রি হওয়ার কথা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আর এঁড়ে গরুর চামড়া ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা।  ব্যবাসায়ীরা বলছেন, একদিকে পুঁজি নেই অপরদিকে সরকার বেঁধে দেয়া দামে চামড়া কেনা কঠিন হয়ে যাবে। 

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী লবণ মজুদ করায় লবণের মূল্য বৃদ্ধি করেছে।  গত দুই বছরে লবণের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।  আগে বস্তা প্রতি লবণের দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা সেখানে এখন তাদের কিনতে হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়।  লবণের দাম কম হলে চামড়ার মূল্য নিয়ে তাদের এত চিন্তা করতে হতো না।  এবার সরকার থেকে বেঁধে মূল্যে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়।  আর ঢাকার বাইরে এর দাম ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।  এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ২০-২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭ টাকায় কিনবেন ট্যানারি ব্যবসায়ীরা। 

এদিকে বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে, এবার শুধু বগুড়া জেলাতে পশু কোরবানির চাহিদা আছে দুই লাখ পশু।  উত্তরের আট জেলায় ১৪ লাখের কাছাকাছি পশু কোরবানির সম্ভাবনা আছে। 

পথে বসার আশঙ্কা পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর

উত্তরের আট জেলা নাটোর, পাবনা, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রামে নিয়মিত এবং মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।  এই ব্যবাসার সাথে খণ্ডকালীন শ্রমিক কাজ করে আরও ১২ হাজার।  গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরা জেলা পর্যায়ের মহাজনদের কাছে টাকা পাবে আর জেলা পর্যায়ের মহাজনরা পাবেন ঢাকার মহাজনের কাছে টাকা।  পর্যায়ক্রমে মফস্বলের সবার টাকা আটকে আছে।  আর এই টাকার ৯০ ভাগ আটকে আছে ঢাকার মহাজনদের কাছে।  তারা এই টাকাগুলো না দেয়াতে প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়রা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করছেন। 

আজ বৃহস্পতিবার শেষ ব্যাংকিং  হবে।  আজকের মধ্যে যদি ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বকেয়া টাকা পরিশোধ না করতে পারে তাহলে এবার চামড়ার বাজার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসে যাবে। 

বগুড়ার চামড়া চামড়া ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন, ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম জানালেন, গত কোরবানি ঈদে বগুড়ার মহাজনরা সমস্ত চামড়া ঢাকার ট্যানারিতে বিক্রি করলেও এখন পর্যন্ত ট্যানারি থেকে তাদের টাকা পরিশোধ করা হয়নি।  ঈদের একদিন বাকি কিন্তু চামড়া কেনার জন্য টাকা কোন মহাজনের হাতে নেই।  ঈদের আগে টাকা পাওয়া যাবে কি না সে বিষয়টি অনিশ্চিত।  যদি টাকা পাওয়া যায় তবে ব্যবসা ভালো হবে না পেলে পথে বসতে হবে। 

বগুড়া চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শোকরানা জানান, ঢাকার পাইকাররা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে রেখে চরম ক্ষতি করছে এখানকার ব্যবসায়ীদের।  আজকের মধ্যে টাকা না দিলে অনেকেই দেনার দায়ে বাড়ি ছাড়া হবেন।