৬:৫২ পিএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আব্দুল জব্বারের দাফন সম্পন্ন

৩১ আগস্ট ২০১৭, ১০:৫৩ পিএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কমঃ ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে..’ কালজয়ী এ গানের কণ্ঠশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারকে বৃহস্পতিবার জাতির অগণিত মানুষ তার গাওয়া এ গানের মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। 

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদক প্রাপ্ত কিংবদন্তি এ শিল্পীর নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।  অঝর ধারার বৃষ্টির মাঝেই সকাল সাড়ে ১১টায় শিল্পীর মরদেহ বারডেমের হিমঘর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। 

শহীদ মিনারে তার নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের পুরো সময়টাই অঝর ধারায় বৃষ্টি ঝরেছে।  তারপরও প্রকৃতির বৈরী পরিবেশ উপেক্ষা করে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ তাদের প্রিয় শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছেন। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে লালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এ কণ্ঠসৈনিকের বিদায় বেলার অঝর ধারার বৃষ্টিকে শহীদ মিনারে উপস্থিত মানুষেরা প্রকৃতির কান্নার সাথে তুলনা করেছেন। 

শহীদ মিনারেই এ কণ্ঠসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রদান করা হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনার।  ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে নির্বাহী মেজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাখাতি ইবনে শাখাওয়াতের নেতৃত্বে একটি চৌকষ দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।  পরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন ভরাট কণ্ঠের অধিকারী এ শিল্পী।  চিরবিদায় বেলায় প্রিয় শিল্পীর কফিনকে ফুলে ফুলে ঢেকে দেন তার ভক্ত-শুভ্যানুধ্যায়ীরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। 

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা এ গায়কের নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানে রাজনীতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণসহ নানা পেশার মানুষের ঢল নামে।  সবাই ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত করেন বাংলা সঙ্গীতাঙ্গণের এ বরপুত্রকে।  তার স্মরণে সেখানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।  খোলা হয় শোক বই। 

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।  এর পরেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।  এ সময় তার সাথে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, ঢাকা দক্ষিণের নেতা শাহে আলম মুরাদসহ আরো অনেকে ছিলেন। 

ওবায়দুল কাদের বলেন, আব্দুল জব্বার সুরের জাদুকর ছিলেন।  বাংলা গানের হেমন্ত মুখোপাধ্যায় হিসেবে তাকে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এ কণ্ঠসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আমাদের আত্মার আত্মীয় ছিলেন।  বঙ্গবন্ধুও তাকে খুব ভালোবাসতেন।  তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে যে গানগুলো গেয়েছেন, তা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এবং কালজয়ী হয়ে আছে। 

প্রায় দু’শ বাংলা সিনেমায় প্লেব্যাক করা দরাজ কণ্ঠের অধিকারী এ শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং সাংসদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসেন।  আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও।  সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।  এ সময় সংস্কৃতি সচিব ইব্রাহিম হোসেন খানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসসহ আরো অনেকে। 

আর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সুভাস সিংহ রায়, জাসদের (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার এমপি, গণফোরামের এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ড. জাহিদ হাসান, আবদুস সালাম, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও নায়ক উজ্জ্বলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), গণতন্ত্রী পাটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন, জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি শরীফ আম্বিয়া, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশের ওর্য়াকার্স পার্টি ও বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

বিশিষ্টজনদের মধ্যে খ্যতিমান কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন, কুদ্দুস বয়াতী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পক্ষে কলমসৈনিক কামাল লোহানী, শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, কল্যাণী ঘোষ, সৈয়দ হাসান ইমাম, আশরাফুল আলম, দেবু ভট্টাচার্য, গণস্বাস্থের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, উদীচীর পক্ষে সভাপতি ড. শফিউদ্দিন আহমেদ, আরটিভির পক্ষে সৈয়দ আশিক রহমান, জাতীয় জাদুঘরের পক্ষে মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষে সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, প্রয়াত শিল্পী আব্দুল জব্বারের বড় ভাইয়ের সন্তানগণ এ শিল্পীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, তথ্যসচিব মরতুজা আহমদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারের কর্মকর্তা ও কলাকুশলীরা অংশগ্রহণ করেন। 

জানাজা শেষে তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, ৬০ এর দশকে আবদুল জব্বার যখন গান গাইতেন, তখন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল।  তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ কণ্ঠসৈনিক ছিলেন।  সারাক্ষণ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকতেন এবং পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, গানের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে বাঙালি জাতিস্বত্ত্বা ও ঐতিহ্যের পক্ষে ভূমিকা রাখতেন। 

তিনি বলেন, একাত্তরের আগুনঝরা দিনগুলোতে তার কণ্ঠে গাওয়া সালাম সালাম হাজার সালাম.., জয় বাংলা, বাংলার জয়.., গানগুলো বাঙালির মুক্তির স্পৃহাকে জাগিয়ে রেখেছিল।  আবদুল জব্বারের সব গান সংরক্ষণ করার জন্য বেতার, ডিএফপিসহ সরকারি দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও মন্ত্রী ইনু জানান। 

বঙ্গবন্ধুর প্রতি আবদুল জব্বারের অনুরাগের কথা তুলে ধরে বড় ছেলে মিথুন জব্বার বলেন, বাবা আমাকে বলত, আমি বাবাকে হারিয়েছি, তবে আজও আমি বাবাকে নিজের মনের মধ্যে ধরে রেখেছি। 

বাবা বলতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই বুঝছেন উল্লেখ করে মিথুন আরো বলেন, সেই বাবাকে আমরা আজকে গানে গানে রেখেছি।  বঙ্গবন্ধুকে গানের মধ্যে তিনি সবসময় মনে করতেন।  আজকে আমার বাবা, আপনাদের বাবা (বঙ্গবন্ধু) উনারা গানে গানে থাকবেন।  উনাদের আমরা ধরে রাখব বলেও তিনি জানান। 

অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত শিল্পী আবদুল জব্বার কিডনি জটিলতার পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ও প্রোস্টেট রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।