১২:৩৪ এএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

প্রতিটি ছাত্রের কাছে একজন শিক্ষক হলেন আয়নার মতো

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৪:৩৮ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম :  মানুষ গড়ার কারখানা হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর।  বাবা মা সন্তান-সন্ততি জন্ম দিতে পারেন, লালন পালন করতে পারেন।  নিজের সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার স্বপ্ন দেখতে পারেন।  কিন্তু একজন শিক্ষক বাবা ও মায়ের সেই সন্তানকে গড়ে তোলেন।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি মানুষ গড়বার কারখানা হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে শিক্ষকরা সেই কারখানার কারিগর। 

একজন কুমার যখন সারাদিন কাদা মাটি ছেনেছিটকে-পাতিল, কুলা-চালুন তৈরী করতে পারেন, শিক্ষকরাও তেমন।  জমিতে চাষ করে পরিপূর্ণভাবে যত্ন করেও বছর শেষে ফসলে কিছু চিটা থেকেই যায়।  অনেক নাম না জানা আগাছাও থাকে সেখানে।  ঠিক তেমননিভাবে এই মানুষ গড়বার কারখানাগুলোর কারিগরদের ব্যাপারটাও এরকম।  প্রতিটি ছাত্রের কাছে একজন শিক্ষক হলেন আয়নার মতো।  তবে সব শিক্ষকই আবার সচরাচর আয়নার মতো নয়।  শিক্ষকরা হলেন এমন এক আয়না যার সামনে দাঁড়ালে কেউ দেখেন অদূর ভবিষ্যতের ভাগ্যাকাশে জ্বলতে থাকা কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।  আবার সেই একই আয়নার সামনে দাঁড়ালে কেউবা দেখেন অন্ধকার বিভীষিকাময় ভবিষ্যত। 

একজন শিক্ষকের মাঝে যে ছাত্ররা তাদের ভবিষ্যতের উজ্জল নক্ষত্রকে দেখতে পায় তারাই জীবনে জেগে উঠে বিজলির মতো।  আর যারা সেটা দেখতে ব্যর্থ হয়, তারা ঝরা ফুলের মতো ঝরে পড়ে নিরবে নিঃশব্দে।  গাছের তলায় পড়ে থেকে শুকিয়ে মিশে যায় মাটির সঙ্গে।  একজন ছাত্রকে যেমন তার শিক্ষকের মাঝে খুঁজে নিতে হবে ভবিষ্যৎ পথ চলার দিকনির্দেশনা ঠিক তেমনি একজন আদর্শ শিক্ষকের আদর্শটা হতে হবে তিনি শিক্ষার্থীদের কতটা সহজভাবে আয়না হয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখাতে পারলেন। 

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো, শিক্ষার্থীদের ভেতর জগৎটা অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখার সক্ষমতা।  অর্থাৎ ছাত্রদের মনের কথা বোঝার ক্ষমতা।  ছাত্রদের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে মূল্যয়নে আনার সক্ষমতা।  একজন শিক্ষক হবেন উদার চেতা, কোমলমতি, মিষ্টভাষি।  যার কথা শুনলে ছাত্ররা হবে তুষ্ট।  মনের ভেতর জ্বলে উঠবে উৎসাহ অনুপ্রেরণার বাতি।  একজন আদর্শ শিক্ষকের কাছে স্কুলের সকল ছাত্রই নিজের সন্তানের মতো।  বাবা-মায়ের কাছে যেমন সকল সন্তানই সমান, ঠিক একজন আদর্শ শিক্ষকের কাছেও তেমনটাই।  বাবা মা যেমন করে সন্তানের ভালো কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠে আদর সোহাগে জড়িয়ে নেন কোলে।  অন্যায় পেলে শাসন করেন।  আবার সন্তানের অভিমান ধুলোয় মিশিয়ে মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। 

 আদর্শ শিক্ষকও এর ব্যাতিক্রম নন।  একজন আদর্শ শিক্ষককে ছাত্রদের সঙ্গে অবশ্যই বন্ধুত্বভাবাপন্ন হতে হবে।  প্রতিটি শিক্ষার্থীর সঙ্গে থাকতে হবে তাঁর সম্পর্ক।  আনন্দের মধ্যে পাঠদান করতে পারলে সেটা ছাত্রদের আমলে নিতে খুব সহজ হয়।  আনন্দের মধ্যে কখন যে কত কি শিখে ফেলে বুঝতেই পারে না শিক্ষার্থীরা। 

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় আদর্শ শিক্ষকের বরই অভাব।  চোখ মেললেই নজরে পড়ে অনেক শিক্ষক।  কিন্তু তাদের মধ্যে আদর্শ শিক্ষক কয়জন? স্কুল, কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কতজনের শিক্ষকের সান্নিধ্য মিলেছে, আর শিক্ষকদেরই বা তাদের কতজনের কথা মনে থাকে? সব শিক্ষকই কি স্থান করে নিতে পেরেছেন শিক্ষার্থীদের মনে? অবশ্যই তা পারেননি। 

শিক্ষকের মনে স্থান করে নিতে একজন শিক্ষার্থীর যেমন ক্লাসের সেরা মেধাবী, নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সচ্চরিত্রের অধিকারি হতে হয়।  অপরদিকে ঠিক একজন শিক্ষককে তার ছাত্রদের মনে স্থান করে নিতে হতে হয় উত্তম চরিত্র ও সুমিষ্টভাষী, বন্ধুসুলভ এবং সহজে আপন করে নেওয়ার মতো গুণের অধিকারি।  তবেই না সেই গুণাবলি মনে রাখে শিক্ষার্থীরা।  অন্যথায় কেউই মনে রাখে না, আর রাখবেই বা কেন?

যখন মাধ্যমিকে পড়তাম ক্লাসের সবাই তখন প্রাইভেট পড়তো।  বিশেষ করে ইংরেজি ও অংক প্রাইভেট পড়তো না এমন শিক্ষার্থী ছিলই না ক্লাসে, সবাই পড়তো।  আমরা তখন ক্লাস টেনে পড়ি।  মোটামুটি হলেও ভাল মন্দ বোঝার জ্ঞান-বুদ্ধি হয়েছিল আমাদের।  গণিত ক্লাস নিতেন এক স্যার।  নাম বলব না।  ক্লাস টাইমে এসে এ গল্প সে গল্প, ভাগিনার গল্প, নিজের ছেলের গল্প বলতে বলতে হাফিয়ে যেতেন। 

এত দ্রুত কথা বলতে পারতেন যে আমাদের মধ্যে অনেকেই স্যারের অগোচরে ক্লাসেই বিড়ি টানতে শুরু করতো।  তখন একটা বিষয় দেখতাম, ক্লাসের যে ছাত্ররা স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তো ক্লাস টাইমে তাদেরকেই বেশ হাইলাইট করতেন তিনি।  আর আমরা ক্লাসের প্রথম বেঞ্চের ছাত্র হলেও আমাদের তেমন নজরে দেখতেন না কখনও। 

স্যারের সামনে কোনো একটা অংকের কথা বলতেই স্যার চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারতেন ওই অংকটা বইয়ের কোন অনুশীলনীর এবং উত্তর কত।  আরও দেখতাম আমরা যারা অন্য স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তাম এই স্যার আমাদের একটু কুদৃষ্টিতে দেখতেন।  আমাদের করা অংক যখন ওনার নিয়মের সঙ্গে মিলতো না তখন স্যার অনেক বাজে মন্তব্য করেই বসতেন আমাদের প্রাইভেট স্যারদের সম্পর্কে।  মাঝে মধ্যে এমনও বলে ফেলতেন যে এ নিয়মগুলো অনেকটা সস্তা নিয়ম।  অথচ উনার নিয়মটাই ছিল ভজগোবিন্দ।  কেননা উনি ছিলেন অংক বিষয়ের নোট বইয়ের ভক্ত।  উল্লেখ্য স্যার সকালে বাসায় ১০০ জনকে প্রাইভেট পড়াতেন দুই ব্যাচে ভাগ করে।  আবার স্কুলে এসে সকালেই পড়াতেন এক ব্যাচ।  আবার স্কুল ছুটির পর পড়াতেন আরো কয়েক ব্যাচ।  অবশেষে সন্ধ্যা লাগিয়ে বাড়ি ফিরতেন। 

অজানা রয়ে গেছে আজও যে স্যার রাতেও প্রাইভেট পড়ান কি না।  অথচ প্রতিবারের পরীক্ষায় আমরা বেশি নাম্বার পাওয়ার পরও ফেল থেকে যেত উনার অনেক ছাত্র, গণিত ক্লাসে যাদের চটপটানিতে টিকে থাকাই ছিল আমাদের মুশকিল।  আমার একজন কাছের বন্ধু ওই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তো।  ফরম ফিলআপে অনেক টাকা লাগায় আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে স্যারের কাছে বেশ কয়েকদিন পড়তে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।  পরে সেই স্যার নাকি প্রাইভেটে আমার সেই বন্ধুকে নিয়ে অনেক কটু কথা বলেছিলেন।  আমার বন্ধু নাকি এসএসসি পরীক্ষায় অংকে পাশই করতে পারবে না। 

আল্লাহর রহমতে আমার সেই বন্ধু অংকে এ প্লাস পেয়েছিল।  কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হয়েছিল যে সেবার অংকে ফেল করা দশজনের মধ্যে সাতজনই ছিল সেই স্যারের ছাত্র।  যারা কিনা জানুয়ারির এক তারিখ থেকে ডিসেম্বরের শেষ পযর্ন্ত কড়া চার্জ দিয়ে টানা প্রাইভেট পড়তো।  অবশেষে স্কুল ডিঙ্গিয়ে বের হওয়ার পর কোনো এক মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম স্যার নাকি মুলতঃ কৃষি শিক্ষার স্যার।  নোট ফলো করতে করতে গণিতে তার এমন হাত এসেছে।  এখন মনে এলেই গায়ে জ্বর আসে। 

স্কুল ডিঙিয়ে কলেজে গিয়েও ক্ষমা পেলাম না এমন দুর্দশা থেকে।  কলেজে আমাদের যিনি ইংরেজি ক্লাস নিতেন তিনি খুব স্টাইলিষ্ট শিক্ষক।  ইংরেজি বলবার সময় মুখ চোখের এমন হাল করতেন, দেখলে মনে হতো এবারই বুঝি উনার জানটা বের হয়ে যাবে।  এমনভাবে হাঁটা-চলা করতেন মনে হতো তার পা বুঝি মাটিতে পড়ছে না।  ওপর দিয়েই হাঁটছেন।  কলেজের অনেকেই তার কাছে প্রাইভেট পড়তেন।  প্রায় পুরো কলেজ এই স্যারের ভক্ত হয়ে উঠল। 

কিন্তু আমরা কয়েকজন পড়তাম ওই কলেজেরই আরেক শিক্ষক আব্দুল হাই স্যারের কাছে।  তিনি আমাদের এলাকার মানুষ।  তারপর আবার বাড়ি কাছে।  তার চেয়ে বড় ব্যাপার ছিল আব্দুল হাই স্যার খুব মেধাবী ও ভাল মানের এক শিক্ষক।  খুব সহজ সরল জীবন যাপন করতেন।  হাই স্যারের ছাত্র ছিলাম বলে ওই স্টাইলিস্ট স্যার আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিতেন।  আমাদের তেমন মালুমই করতে চাইতেন না।  কলেজের একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় হাই স্যারের ছাত্রী হিসেবে বিলকিস সেবার ইংরেজিতে ৮৬ নম্বর পেয়ে ক্লাসে প্রথম হলো।  এতে ওই স্যারের মানসম্মানে বিরাট আঘাত লেগেছিল। 

কলেজে প্রতি মাসে একটা পরীক্ষা হতো।  এতে ইংরেজি প্রশ্ন করার দ্বায়িত্ব ছিল ওই স্যারের ওপর।  আমরা সারা রাত জেগে পড়ে যেতাম।  সকালে কলেজের বারান্দায় পা রাখার পর তার প্রাইভেট ছাত্রদের মুখে গুঞ্জন শুনতাম টেস্ট পেপারের ১১৮ পৃষ্ঠা।  নবদূতের ১৩ নম্বর মডেল হুবহু।  এর মানে স্যার উনার প্রাইভেট ছাত্রদেরকে আগেভাগেই প্রশ্ন আউট করে দিতেন।  আমি এবং অনেকেই সাক্ষী। 

হাই স্যার নিজে টাকা খরচ করে টেস্ট পরীক্ষার আগে দুই তিন মাস অনেক শিক্ষার্থীকে ওই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়িয়েছেন।  কেননা যারা একটু দুর্বল এবং হাই স্যারের কাছে পড়ে তাদের যে ওই দুর্নীতিবাজ স্যার পাশ করাবেন না সেটা সবার জানা ছিল।  অগ্রিম টাকা দিয়ে ওই স্যারের কাছে সেই সময় পড়তে হয়েছে অনেককেই।  সেটা না করেও উপায় ছিল না।  কারণ তখন কলেজের আইন ছিল যারা টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করবে না তাদের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপ করতে দেওয়া হবে না।  মানে এক বছর লস দিতে হবে। 

এখনকার স্কুল কলেজগুলোতে চোখ রাখলে দেখা যায় এমন দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের অভাব নেই।  যে সমস্যার ভুক্তভোগী আমরা হয়েছিলাম, সেই একই সমস্যায় ভুগছে আমাদের ছোট ভাই বোনেরা।  এরকম চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ভাই ভাতিজার ছেলে মেয়েদেরকেও যে কেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আল্লাহ ভালো জানেন।  #

লেখক : মো. আখলাকুজ্জামান, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও চলনবিল প্রেসক্লাব নির্বাহী সদস্য।