৮:০৪ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | | ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস একদিন আমিও বুড়ো হবো

০১ অক্টোবর ২০১৭, ১২:৪১ এএম | সাদি


কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় প্রতি বছরের ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।  জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।  অনেক বছর পেরিয়ে গেছে।  কিন্তু বাস্তবে কতটুকু উন্নতি হয়েছে এ দেশের প্রবীণদের।  এবারো দিবসটি পালিত হবে।  হিসাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭ ভাগ প্রবীণ।  বাংলাদেশে প্রবীণদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ বিধবা।  শিশু মৃত্যু এবং জন্মহার কমে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  ২০২৫ সালে ৯ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ১৭ শতাংশ হবে।  তখন প্রবীণরা আরো অবহেলার শিকার হবে। 

একদিন আমিও বুড়ো হবো।  সবে তো ত্রিশে পদার্পন করেছি।  এখনো অনেক বাঁকী প্রবীণ হতে।  তবুও তো সেই শিশুকাল থেকে কিশোর, বালক পেরিয়ে যুবকে পরিণত হয়েছি এই আমি।  এরই মাঝে অনেক স্মৃতি, বেদনা, হাতাশা, আশা, ভালো লাগা, মন্দলাগা, ভালোবাসা, পরিচয়, পরিনয়।  সব মিলিয়ে অনেক কিছুই।  বছর দুয়েক হলো।  পরিচয় থেকে পরিণয়ে রুপান্তরিত হয়েছি।  মাঝে গতকাল একমাস পুর্ণ হয়েছে সংসারের নতুন অতিথির বয়স।  কণ্যা সন্তানের জনক হওয়ায় আনন্দে উদ্বোলিত ছিলাম গত মাসেও।  আজকেই একমাস পার হয়ে গেলে।  তাই ভাবনা থেকে অনেক দুর পর্যন্ত গড়িয়েছে।  আর সে থেকেই আজকের এই প্রবীনদের নিয়ে আমার এ লেখা।  কারন একসময় আমিও প্রবীণ হবো।  সেদিন আর বেশিদুরে নয়।  তখন কি হবে আমার।  এই উৎকন্ঠা থেকে আমার এ লেখা। 

আমাদের সমাজে একটি প্রবাদবাক্য প্রচলিত আছে যদি কিছু শিখতে চাও- তিন মাথার কাছে যাও।  আর এই তিন মাথা হচ্ছে আমাদের প্রবীণ সমাজ, আমাদের শেকড়।  অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক, এখন সমাজের উন্নতির সাথে সাথে আমরা সে শেকড়টি যেন উপড়ে ফেলছি।  আমাদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী আজ চরম দুঃখ-দুর্দশায়।  অসহায় ও বঞ্চনার মধ্যে তাদের শেষ দিনগুলো পার করে দিচ্ছে। 

বর্তমান সমাজে প্রবীণ নাগরিকরা তিনভাবে অবস্থান করেন।  কিছু পরিবারের সন্তানসন্ততি তাদের মা-বাবার প্রতি যত্নবান হয়।  সে ক্ষেত্রে তারা মা-বাবার সঙ্গে থাকে।  মা-বাবাদের এ ক্ষেত্রে বিশেষ সমস্যা নেই।  বহু বয়স্ক মা ও বাবা, যাঁরা আর্থিক সংগতিসম্পন্ন তাঁরা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন, তাঁদের প্রতি যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়।  অনেক সময় ছেলে বা মেয়েরা প্রবাসী হলে মা ও বাবা বয়স্ক হওয়ার কারণে বৃদ্ধাশ্রমের জীবন বেছে নেন।  সেখানে পাঁচজনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা যায়।  নিরাপত্তাও আছে।  অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী একটি পরিবারের যিনি জীবিত থাকেন, বয়স হয়ে গেলে বৃদ্ধাশ্রম বেছে নেন। 

প্রবীণ নাগরিক বা দম্পতি যাঁদের যথেষ্ট আর্থিক সংগতি নেই, তাঁরাই বেশি সমস্যায় ভোগেন।  অনেকেই অর্থাভাবে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে পারেন না।  অন্যদিকে বাড়িতে থেকে অবহেলার শিকার হন।  বিশেষত নিঃসন্তান বৃদ্ধ দম্পতি হলে সমস্যা অনেক বেশি হয়।  তাঁরাই বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।  আমার দৃষ্টিতে কুষ্টিয়ায় প্রবীণ সংঘ থাকলেও সেখানে গুটিকতোক প্রবীনদের একসাথে বসে চায়ের আড্ডা জমাতে দেখি।  অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন রেলস্টেশন, চায়ের দোকান কিংবা কোন এক নির্জনস্থানে কিছু প্রবীণ মানুষ বিকেলে আড্ডা দিচ্ছেন।  অথচ এই প্রবীণ মানুষদের জন্য কিছুটা জায়গা নিয়ে যদি পার্কের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সেখানে তাঁরা বিকেলের দিকে গিয়ে গল্পগুজব করতে পারেন।  তবে সমষ্টি প্রবীণদের জন্য যদি ভালো কিছু করা যেতো। 

তুমি আজ প্রবীণ।  অথচ এই তুমিই একসময় ছিলে শিশু।  তোমাকে কত যত্মে শিশু থেকে প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনে মানুষ করে গড়ে তুলে আজ সেই তুমিই হয়েছো প্রবীণ।  অথচ সমাজে অনেক প্রবীণরা আছে।  যারা আর সেই আগের অধিকার থেকে অনেকটাই বঞ্চিত।  যেই পিতামাতা কষ্ট করে মানুষ করে গড়ে তুলেছে, আদর যত্ম দিয়ে সন্তানকে বড় করে তুলেছে, আজ সেই পিতামাতাকে কেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হবে? কেনই বা একমুঠো অন্ন জুটবে না তার জন্য।  কিংবা কেনই বা সেই পিতামাতা তোমার কাছে কেন বোঝা হিসেবে গণ্য হয়, তা আমার বোধগম্য নয়?

যাদের বাবা-মা আছে তাদের বুঝতে হবে যতই অভাব-অনটন থাকুক না সবার উপরে বাবা-মা।  তাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমরাও এক সময় বৃদ্ধ হবো।  কাজেই তাদেরকে কোনভাবে উপেক্ষা করা যাবে না, কখনই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর কথা ভাববো না।  এজন্য সকল পেশাজীবীর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।  আমাদের সুশীল সমাজ সুষ্ঠু রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন।  তারা কোথাও প্রবীণ বিষয় নিয়ে কথা বলে না।  আমাদের সীমিত আয় ও অর্থের মধ্য দিয়ে আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে সুন্দরভাবে দিন কাটাতে চাই।  কয়েকজন প্রবীণ আক্ষেপ করে এভাবেই বলেন, বিভিন্ন বাসে মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য সিট বরাদ্দ থাকে।  কিন্তু যারা প্রবীণ, বয়সের ভারে ন্ব্যুজ্ব তাদের কোন আলাদা সিট থাকে না।  একজন মানুষের বয়স ৭০ পার হলেই তার শরীরের মজ্জা ধরে।  সে সময় একা চলা কঠিন হয়ে পড়ে।  এটাও কি বিড়ম্বনা নয় প্রবীণদের জন্য?

আর তাই প্রবীণদের দাবী এমনটাই, নতুন শিশু জন্ম নিয়েছে এবার পুরনোকে মৃত ও ধ্বংসস্তূপে স্থান নিতে হবে।  তবে যতদিন প্রবীণেরা জীবিত আছেন, ততদিন এ পৃথিবীর জঞ্জাল পরিষ্কার করে নবীনদের বাসোপযোগী করে তোলার দৃপ্ত অঙ্গিকার করতে হবে। 

আমি নিজইে এখনও ভাবি, যখন বুড়ো হবো।  তখন কি হবে ? ভাবতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ! আল্লাহ না চোখ ভিজে আসে।  তখন ভাবি আমি বুড়ো হবো, সাথে থাকবে আমার বুড়িটা।  আর তখন চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে ওকে ডাক দিয়ে বলবো, এই শোনো, "এক কাপ চা হলে মন্দ হয় না।  কিন্তু এসব কি আদৌ সম্ভব হবে।  তখন তো মনে হবে দিন দিন বুড়ো হচ্ছি আর মনে হচ্ছি যেন শিশু হয়ে যাচ্ছি। 

কিন্তু পরিশেষে কবি জীবননান্দ দাশের মতো বলতে চাই,
হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো,
বুড়ি চাঁদটারে আমি ক’রে দেবো
কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু-জনে মিলে শূন্য ক’রে
চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার। 

লেখক: এস এম জামাল, সংবাদিক, কলামিষ্ট