১১:২২ পিএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার | | ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে দুই দিন ধরে সবজির বীজ ও সার বিতরণ করা হয়

০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০৯:০৮ পিএম | রাহুল


আবুল হোসেন, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গতকাল শুক্রবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে দ্বিতীয় দিনের মতো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ আরো দেড় শতাধিক কৃষক-কৃষাণীর মাঝে দেওয়া হলে ছয় প্রকার শাক-সবজির বীজ সার। 

উপজেলার পূর্ব উজানচর শামসু মন্ডলের বাজারে উজানচর ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের কিছু এলাকার কৃষক পরিবারের মাঝে ঢেড়স, মুলা, লাল শাক, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা শাক, শরিষার বীজ ও সার প্রদান করা হয়।  এর আগে বৃহস্পতিবার দিন উপজেলার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের প্রায় দেড়’শ কৃষককে শাক সবজির বীজ ও সার দেওয়া হয়।  

শুক্রবার বীজ নিতে আসেন পূর্ব উজানচর মাখন রায় পাড়ার কৃষাণী দিন মজুর সুদেব বিশ্বাসের স্ত্রী সুচিত্রা বিশ্বাস (৩০)। 

তিনি বলেন, নিজের জমি-জাতি নাই।  অন্যের প্রায় দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে সংসার চালান।  স্বামী বাইরে কখনো দিন মুজুর আবার কখনো বাজারের কাঠের ফার্নিচারের দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করেন।  তাই তিনিই বাড়ির কাছে ওই দুই বিঘা জমিতে শাক-সবজির আবাদ করেন।  বন্যায় সব কিছু তলায় যাওয়ার পর ভেবে পাচ্ছিলামনা কি করবো।  তই অহন সাহস পাইছি।  আপনাগো কাছ থেইকা ছয় প্রকার শাক-সবজির বীজ ও সার পাইয়া অহনো বুনবো। 

পাশের গফুর মন্ডল পাড়া গ্রাম থেকে এসেছিলেন আরেক কৃষাণী আকলিমা বেগম (৫০)।  তিনি মানুষের বিপদের কথা শুনলেই ছুটে যান সেখানে।  নিজের সংসার চালানোর তো ব্যবস্থা করতে হবে।  তাই নিজেই বাড়ির কাছে প্রায় আড়াই বিঘা বর্গা জমিতে বিভিন্ন শাক-সবজির আবাদ করেন।  প্রথম আলো ট্রাস্টের দেওয়া এসব শাক-সবজির বীজ ও সার পেয়ে খুবই খুশি।  এসময় বলেন, ভাই আপনাগো দাওয়াত রইলো।  এই শাক-সবজি ফলাইয়া আপনাগো খাওয়ামু।  আসতেই অইবো।    

উজানচর ইউনিয়নের শেষ সীমানা বকারটিলা থেকে অনেক কষ্টে সার ও বীজ নিতে এসেছিলেন দুলাল তালুকদার (৬০)।  তিনি জানান, বন্যায় সব কিছু শেষ হয়ে গেছিল।  উপায় ভেবে পাচ্ছিলামনা।  এখন মনে সাহস পাইছি।  যদিও আরো সার লাগবো।  কিন্তু এডাই দেয় কিরা।  আপনাগো পরথম আলো থেইকা এমন উপকারের কথা কখনোই ভুলবনা। 

শুক্রবার বেলা এগারটার দিকে পূর্ব উজানচর শামসু মন্ডলের বাজারে ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান আসা কৃষক-কৃষানী জড়ো হয়।  দেড় শতাধিক কৃষক পরিবারের প্রত্যেককে লাল শাক, মুলা শাক, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা, ঢেড়স, শরিষার বীজ দেওয়া হয়।  একই সাথে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ এমন ৩০জন কৃষকের মাঝে সারও প্রদান করা হয়।  এসময় স্থানীয় বাজারের প্রতিষ্ঠাতা শামসু মন্ডল, ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা লক্ষন কুমার দাস, গোয়ালন্দ সরকারী কামরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক আউয়াল আনোয়ার, ইউপি সদস্য আব্দুল কাদের, নুরুল ইসলাম খবির, প্রথম আলো প্রতিনিধি এম রাশেদুল হক, বন্ধুসভার সভাপতি শেখর আহম্মেদ বাবু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সোহাগ, জাহিদ ফকির, মইনুল হক মৃধা, নাজমুল হাসান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।  এর আগের দিন বৃহস্পতিবার উপজেলার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের প্রায় দেড়’শ কৃষক পরিবারের মাঝেও বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজির বীজ ও সার প্রদান করা হয়।  দুই দিনে বন্ধুসভার সদস্যদের সহযোগিতায় তিন শতাধিক কৃষককে বীজ ও সার প্রদান করা হলো। 

এর আগে বৃহস্পতিবার দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় সার ও বীজ প্রদানের।  সেখানে আসেন দেবগ্রামের বাসিন্দা, নদী ভাঙ্গনে সর্বহারা কৃষক আজিত খান (৫০)।  আলাকপালে তিনি বলেন, “বাপ-দাদার প্রায় ২৬ পাহি (বিঘা) জমি ছিল।  নদীতে সব ভাইঙ্গা অহন জমিজাতি কিচ্ছু নাই।  মাইনসের জমি সনকরা নিইয়া চাষ কইরা খাই।  ধান-টান যা বুনছিলাম তাও বাইস্যায় (বর্ষা) শেষ।  অহন আপনগোর কাছ থেইকা যে বীজ-সার পাইলাম এটা আমার খুব উপকার দিব।  অহনি নিয়া খেতে বুনবো।  এই পরথম কেউ সার-বীজ দিল”।  কথাগুলো বলছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার আজিত খা(৪৯)। 

বৃহস্পতিবার সকালে দেবগ্রামের অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় দেড়’শ কৃষকের মাঝে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে বন্ধুসভার সহযোগিতায় সার ও ছয় প্রকার শাক-সবজির বীজ প্রদান করা হয়।  বীজ নিতে আসেন পাশের দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল মোল্যা (৫৫)।  ছয় প্রকার শাক-সবজির বীজ ও সার পেয়ে খুশিতে আত্নহারা।  আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, বন্যার সময় একবার একটা স্লিপ পাইছিলাম।  বন্যার পর আর কেউ আমাগো খোঁজ নেইনি।  পরথম আলো’র পত্রিকার এমন উদ্যোগ খুবই ভালো হইছে। 

ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মাঝে নানা প্রকার শাক-সবজির মধ্যে ঢেঁড়স, লাল শাক, মুলা শাক, শরিষা, মিষ্টি কুমড়া ও ডাটা শাকের বীজ প্রদান করা হয়।  সেই সাথে অর্ধশত কৃষকের মাঝে তিন কেজি করে টিএসপি, এক কেজি ইউরিয়া ও এক কেজি করে পটাশ সার প্রদান করা হয়।  একজন কৃষক ছয় প্রকার শাক-সবজির বীজ ও পাঁচ কেজি করে সার পাওয়ায় অনেকে খুশি হন। 

এসময় কৃষকদের বীজ বপনের নিয়ম ও যত্নের উপর বক্তব্য রাখেন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ মন্ডল, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুঞ্জুর রহমান, প্রথম আলো প্রতিনিধি এম রাশেদুল হক প্রমূখ। 

এসময় অন্যান্যের মধ্যে বন্ধুসভার উপদেষ্টা অধ্যাপক কামরুল ইসলাম, সভাপতি শেখর আহম্মেদ বাবু, সাধারণ সম্পাদক রমেশ কুমার আগর ওয়ালা, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সোহাগ, ফকির জাহিদ হোসেন, শুভ্র সাহা, মইনুল হক মৃধা, আকাশ সাহা, নাজমুল হাসান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।