৩:১৪ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

পরকিয়ায় আচ্ছন্ন বতর্মানে নারী-পুরুষের দায়িত্ব : মোমিন মেহেদী

০৬ নভেম্বর ২০১৭, ০২:২৮ পিএম | মুন্না


এসএনএন২৪.কম : মায়ের ব্যাপারে অনেক কথা প্রচলিত রয়েছে।  তার মধ্যে অন্যতম কথাগুলো হলো- ‘১) একজন জন্মদাত্রী মা যদি শারিরীক ও মানসিকভাবে সুস্থ্য হয় তবে সে তার সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।  ২) সন্তানের ভরণপোষণের জন্য যখন সেই মা রোদ-বৃষ্টিতে কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানের মেরুদন্ড শক্ত করে সন্তানটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখে তখন সন্তানটি নিরাপদ।  ৩) তালাক হবার পর সন্তানের ভরণপোষণের দ্বায়িত্বটা কিন্তু কিছুটা হলেও বাবার। 

সেটা হটাও করে বলার কিছু নেই।  এটা নিয়ে সেই বাবারাই বলে যাদের আত্মসম্মানবোধ ক্ষানিকটা হলেও কম।  ৭দিনে ১দিন সন্তানকে নিয়ে দুগালে দুটো চুমু দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।  ৪) বিবাহ বিচ্ছেদের পর গার্জিয়ানশীপের জন্য কোর্টে আবেদন না করে সৎ মায়ের কাছের একটি শিশু সন্তানকে যে মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিতে চায়, সে কি আসলেই তার সন্তানকে ভালোবাসে? ৫) সন্তানটি যখন মেয়ে তখন সে আইনগতভাবে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছেই থাকার নিয়ম আছে যদি মা সন্তান পালনে এবং নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হন। 

৬) বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানটি যার কাছে থাকে তার কাছেই ট্রাভেল ডকুমেন্ট (পাসপোর্ট) থাকার কথা।  কেউ যদি পাসপের্ট আটকে রাখে তবে তা আইনগত অপরাধ।  ৭) একজন মানুষ যদি মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত থাকে তার সন্তানটিকে নিয়ে (অপহরণ করা হবে) তবে সেটাও একটা ক্রাইম।  ৮) পৃথিবীর কোনো দেশই বাবা-মায়ের মৌখিক ও লিখিত মতামত ছাড়া শিশু সন্তানকে ভিসা প্রদান করে না। ’ এছাড়াও প্রচলিত আছে- ‘মা ডাকটি অতি মধুর যায় না ভোলা মাকে/ সব ভুলে যায় আদর করে মাকে যখন ডাকে। 

মায়ের বুকেই সন্তান নিশ্চিন্তে ঘুমায়, সেটা আদালত কেনো; পৃথিবীর সবাই জানলেও ক্রমশ সেই নিশ্চিন্ত-নিরাপত্তা আর আন্তরিকতা-ভালোবাসা-স্নেহ-আদর কমে যাচ্ছে।  এই কমে যাওয়ার রাস্তায় অন্ধকার ক্রমশ এগিয়েই চলছে। 

এতটাই এগিয়ে গেছে যে, স্বামীকে হত্যা তো করেছেই, নিজের কন্যাকেও হত্যা করেছে।  গণমাধ্যম বলছে যে, বাড্ডার ময়নারনগর এলাকার একটি বাসার নিচতলায় স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকতেন গাড়িচালক জামিল শেখ।  তখন ওই বাসার তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া শাহিন মল্লিকের সঙ্গে পরিচয় হয় জামিলের স্ত্রী আরজিনার। 

শাহিন সবসময় আরজিনার প্রশংসা করত এবং একসময় দুজন দুজনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে।  ভালো লাগা থেকে দুজন সম্পর্কে জড়িয়ে যান।  তখন থেকে আরজিনার সঙ্গে যেকোনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো জামিল শেখের।  বৃষ্টির কারণে বাসার নিচে পানি জমে যাওয়ায় রাগ করে আরজিনা বাবার বাড়ি চলে যায়।  পরে নতুন বাসা নেয়ার শর্তে আরজিনা স্বামীর কাছে ফিরে আসেন এবং একই এলাকায় আরেকটি বাড়ির চিলেকোঠায় সাত হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেন জামিল শেখ।  তখন আরজিনা কৌশলে পূর্বপরিচিত হিসেবে প্রেমিক শাহিনকে তিন হাজার টাকায় সাবলেট নেন। 

পুলিশের ভাষায়, শাহিন তার স্ত্রী মাসুমাসহ সাবলেট হিসেবে উঠলে আরজিনা ও শাহিনের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।  সন্তানকে হত্যার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীদের একটি বড় অংশ।  শাহিনের স্ত্রী মাসুমা অন্যের বাসায় কাজ করত আর আরজিনার স্বামী জামিল সকালবেলা কাজে বের হয়ে যেত। 

তখন শাহিন ও আরজিনা ফোন ছাড়াই কথা বলতে পারত।  ইচ্ছেমতো কাছে আসতে পারত।  তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ডিসি বলেন, শাহিনকে কাছে পেতে নতুন কৌশল অবলম্বন করে আরজিনা।  একপর্যায়ে আরজিনা জামিলকে তালাক দিয়ে শাহিনের সঙ্গে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।  তবে শাহিন তাকে তালাক না দিতে বলেন এবং দুজন মিলে জামিলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। 
একই বিছানায় শুয়ে ছিল জামিল, আরজিনা, নুসরাত ও তার ছোট ভাই আলভি। 

আরজিনা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘরের দরজা খুলে ঘুমায়।  তখন শাহিন বাড়ির নিচ থেকে একটি কাঠের টুকরা এনে ঘরে ঢুকে জামিলের মাথায় আঘাত করে।  প্রথম আঘাতের পর জামিল উঠে যায় এবং জিজ্ঞেস করে কেন তাকে আঘাত করা হলো।  এরপর শাহিন কোনো কথা না বলে আরও কয়েকটি আঘাত করে তাকে হত্যা করে। 

এসময় ঘুম থেকে জেগে ওঠে মেয়ে নুসরাত।  সে শাহীনের কাছে বাবাকে কেন মারা হলো তা জানতে চায় এবং চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে থাকে।  তখন নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে শাহিন।  তবে প্রথমবার এতে আরজিনা সম্মতি দেয়নি।  পরবর্তীতে বিপদে পড়ার আশঙ্কায় মেয়েকে হত্যার সম্মতি দেয় মা আরজিনা।  তখন নুসরাতকে ঘরের বিছানায় ফেলে গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করে শাহিন।  তবে নুসরাত চিৎকার করায় তার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে তাকে মেরে ফেলা হয়। 

এমন একটা পরিস্থিতিতে এগিয়ে চলছে আমাদের সময়।  আমরা এই সময়ে আর চলতে চাই না বিধায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে।  মায়ের প্রতি সন্তানের সম্মান যেমন বাড়াতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ-আদর বাড়াতে হবে।  দা না হলে ক্রমশ সমস্যার জালে বন্দী হয়ে এগিয়ে আসবে অন্ধকার। 

যেই অন্ধকারের একের এক গল্পের সূত্রতায় গণমাধ্যম বলছে যে, দুই হত্যাকান্ডের পর ছাদে শাহিন ও আরজিনা গল্প সাজাতে থাকে।  একপর্যায় তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে কেউ জিজ্ঞেস করলে ডাকাতরা জামিল ও তার মেয়েকে হত্যা করেছে বলবে।  এছাড়াও ডাকাতরা যাওয়ার সময় তাকে ধর্ষণ করেছে বলে দাবি করবে আরজিনা। 

এই নাটক বাস্ত্মবে রূপ দেয়ার জন্য সারারাত ছাদের সিঁড়ির সামনে মুখ গোমড়া করে বসেছিল আরজিনা।  সেই ভোরেই স্ত্রী মাসুমাকে নিয়ে খুলনায় পালিয়ে যায় শাহিন।  এ ঘটনায় তদন্তে আশপাশের অনেকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।  বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা শিশুও কিছু তথ্য দিয়েছে।  সব মিলে এ পর্যন্ত হত্যাকান্ডের সঙ্গে এই দুজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।  একদিকে মা সন্তানকে পরকিয়ার কারনে হত্যা করছে; অন্যদিকে পরকিয়ার কারনে মা এবং সন্তানকে একসাথে হত্যা করানো হয়েছে।  এই হত্যার রাস্তায় এগিয়ে চলার মূল কারণ হলো পরকিয়া।  এই পরকিয়া থেকে বের হয়ে আসবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে। 

পরকিয়া কখনোই ভালো কিছু দিতে পারে নি।  বরং পরকিয়ার কারনে নির্মমতার অন্ধকার ঘণিভূত হতেই থাকবে।  পরকিয়াকারী পারভিন আক্তার মুক্তাকে তার স্বামী আবদুল করিম তালাক দিতে চেয়েছিলেন।  এতে মুক্তা আত্মহত্যার চেষ্টা চালানোর পর জনি এই হত্যার পরিকল্পনা করেন।  মুক্তা ব্যবসায়ী করিমের তৃতীয় স্ত্রী। 

খুন হওয়া শামসুন্নাহার তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন।  গত বুধবার হত্যাকান্ডের দিন করিমকে এবং পরদিন মুক্তাকে আটক করে পুলিশ।  শামসুন্নাহারের ভাইয়ের করা মামলায় তাদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে গোপালগঞ্জে গ্রেপ্তার করে জনিকে (৩৩)।  শামসুন্নাহারের ভাই আশরাফ আলী মামলায় অভিযোগ করেছিলেন, জনি কয়েকজনকে নিয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটান। 

হত্যার মধ্য দিয়ে স্বার্থ হাসিলের এই চেষ্টাকে কোন না কোনভাবে প্রতিহত করতে হবে।  তা না হলে যেভাবে জনি ১০০ টাকার ছরি দিয়ে হত্যা করেছে পরকিয়াক্রান্ত বোনের সংসার টিকানোর জন্য।  ঠিক সেভাবে ক্রমশ একের পর এক ঘটনা ঘটোই যাবে।  যেভাবে ঢাকার নিউমার্কেট থেকে ‘১০০ টাকায় একটি চাকু কেনার পর’ শামসুন্নাহারের কাকরাইলের বাসায় গিয়েছিলেন জনি। 

‘সে কলিংবেল চাপলে কাজের বুয়া দরজা খুলে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়।  তখন সে রান্নাঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়ে প্রথমে চাকু দিয়ে শাওনকে আঘাত করে এবং তাকে চুপচাপ বসে থাকতে নির্দেশ দেয়।  এরপর সে শামসুন্নাহারের ঘরে গিয়ে তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে।  শাওন উঠে গিয়ে তার মাকে রক্ষার চেষ্টা চালালে তাকে আবার আঘাত করে আল আমিন। ' এরপর শাওন বাসা থেকে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে পড়ে যান। 

ওই সময় ঘরে থাকা রাশিদার দাবি, তিনি রান্নাঘরে কাজ করার সময় হঠাৎ বাইরে থেকে কেউ দরজা আটকে দিয়েছিল।  পরে দারোয়ান নোমান ছিটকিনি খুলে দিলে তিনি বেরিয়ে আসেন।  ততক্ষণে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে খুনিরা পালিয়ে যায়।  অথচ এই শামসুন্নাহারকে ২৮ বছর আগে বিয়ে করেন করিম।  পরে তিনি ফরিদা নামে এক নারীকেও বিয়ে করেন। 

ফরিদার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি চার বছর আগে মুক্তাকে বিয়ে করেন।  করিম গ্রোসারি ব্যবসা ছাড়াও এফডিসি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের প্রযোজনা ও পরিচালনায় যুক্ত বলে পুলিশ জানিয়েছে।  শামসুন্নাহারের ভাইয়ের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তৃতীয় বিয়ের পর থেকে শামসুন্নাহার ও ছেলের খোঁজ ঠিকমতো নিতেন না করিম।  মুক্তা তিন-চার মাস আগে এই বাড়িতে এসে শামসুন্নাহারকে ভয়ভীতি এবং হত্যার হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন। 

মুক্তার সঙ্গে দ্ব›দ্ব শামসুন্নাহারের।  প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে এই দ্ব›েদ্বর কারণে প্রায় চার মাস আগে মুক্তাকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন করিম।  এই সিদ্ধান্তের কারনে নির্মমতার আশ্রয় নিয়েছে জনি।  যেই জনি নিজের বোনের জন্য নির্মমভাবে মা আর সন্তানকে হত্যা করেছে; সেই জনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারাদেশে।  সেই জনিদেরকে নিবৃত করতে বিচার বাস্তবায়ন করতে হবে খুব দ্রæত।  বিচার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিতে হবে এই সকল ঘাতকশ্রেণীর মানুষের মধ্যে। 

তা না হলে ক্রমশ সমস্যার জাল বড় হতেই থাকবে।  এই জালে বন্দী হবে বাংলাদেশ; বন্দী হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা।  এই অবস্থার উত্তরণে এগিয়ে আসা সময়ের দাবী।  এই সমস্যা থেকে উত্তরণে নিবেদিত থাকা প্রয়োজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-এমপি-আমলা-প্রশাসনের সকল স্তরে দায়িত্বশীলদেরকে।  তা না হলে বাড়বে অপমৃত্যু, বাড়বে সমস্যা।  মৃত্যু মিছিল থেকে মুক্তির জন্য পরকিয়ামুক্ত নির্মাণে নিবেদিত থেকে এগিয়ে যাওয়াটা এখন সময়ের দাবী।