৮:০২ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

শিক্ষা আইনের খসড়ায় প্রাইভেট টিউশনি : কবির কাঞ্চন

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:২৫ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : "ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন দিনে কিবা রাতে
পেশাজীবী শ্রম দিয়ে যান অর্থনীতির খাতে। 

ডাক্তার সাহেব অফিস শেষে বসেন তার চেম্বারে
রোগীদেখা বাড়ায় জ্ঞান অভিজ্ঞতার সম্ভারে। 

রাজনীতিবিদ রাজনীতির  চর্চা করেন যেমন
ব্যবসা কিবা অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েন তেমন। 

নায়ক গায়ক ইঞ্জিনিয়ার হোক যেকোন পেশা
উর্ধ্বমুখীর এই সমাজে পায় না কোন দিশা। 

বাবামায়ে আশা নিয়ে ছেলেমেয়ে পড়ান
শেষ বয়সে সন্তানেতে হাতটা আবার বাড়ান। 

এইদেশে পড়া শেষে শিক্ষক হন যিনি
চলার মতো  বেতনভাতা নাহি পান তিনি। 

স্কুল-কলেজে পড়ানো পর একান্ত অবসরে
শিক্ষকরা ছাত্র পড়ান জাতি গড়ার তরে। 

শিক্ষক যদি বাইরে পড়ান ক্লাস ফাঁকি দিয়ে
অসম্মানে পড়তে পারেন বেতনভাতা নিয়ে। 

প্রাইভেট টিউশনি যদি বন্ধ হয়ে যায়
মেধাবীরা আসবে না আর মহান এই পেশায়। 

মাথায় কারো অসুখ হলে ঔষধ খেতে হয়
মাথা ব্যথায় মাথা কাটা চিকিৎসা তো নয়। "

পেশায় আমি নিজে একজন শিক্ষক।  অনার্স মাস্টার্স পাস করে নিজের পছন্দের পেশায় প্রবেশ করলাম।  হাতের কাছের অনেক লোভনীয় চাকরিও ভাল লাগার কাছে ম্লান হলো।   এ পেশায়  সম্মান পেয়েছি।  কিন্তু সম্মান ধরে রেখে চলার মতো বেতনভাতা পাইনি।  আমার মতো সারাদেশের শিক্ষকসমাজ পাচ্ছেন না। 

বেসরকারি এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে শিক্ষকের সম্মানী ১৫০০-৫০০০ টাকা।  বর্তমান দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে এই সম্মানী খুবই করুণ! তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই অল্প বেতনে কেন চাকরি নিলেন ঐ শিক্ষক? এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি তথা ঘুষের রাজ্যে মেধাবীরাও টিকে থাকার এই মিছিলে নামতে বাধ্য হয়।  তাদের আশা একটাই প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু আর অবসর সময়ে কিছু শিক্ষার্থী পড়িয়ে কোনমতে সংসার খরচ চালানো। 

কিন্তু আইন করে শিক্ষকের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করা হচ্ছে।  শিক্ষক প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে কোন জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন না।   বিষয়টি খুব দুঃখজনক। 

একজন ডাক্তার তার অফিস শেষে নিজস্ব চেম্বারে বসে মাত্র ৫/১০ মিনিট রোগী দেখে ৫০০/১০০০ টাকা ভিজিট নিলে তার উক্ত বিষয়ে জ্ঞান বাড়ে।  তাতে কোন সমস্যা নেই।  অথচ সেই ডাক্তার যারা তৈরি করেন তারা পুরো একমাস প্রাইভেট পড়িয়ে ৫০০/১০০০ টাকা সম্মানী নিলে সেটা চরম দোষের বলে গণ্য হয়। 

একজন ব্যবসায়ী সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার জন্য দিনে রাতে খাটুনি করেন।  ব্যবসাকে ঘিরেই তার উন্নতির পৃথিবী।  এক্ষেত্রে সারাদিন ব্যবসায়িক চিন্তা করলে তা কি আইন করে নিষিদ্ধ করা হবে!

একজন রাজনীতিবিদ রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে পারেন, করেন।  তাই বলে কি তা আইন করে নিষেধ করা হবে!

এবার আসা যাক আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা কতোটা জরুরি।  আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা করাতে খুব হিমশিম খান।  নিজেরা খেয়ে না খেয়ে কাল কাটালেও সন্তানের উজ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।  তাঁদের অধিকাংশের মনের বাসনা - শেষ বয়সে উচ্চশিক্ষিত সন্তান ভাল চাকরি করে  সারাজীবনের কষ্টকে ভুলিয়ে দিবে। 

শিক্ষকতা পেশায় উপরি পাওয়ার কোন উপায় নেই।  একটাই সুযোগ আছে সুন্দর সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার।  আর তা হলো- ক্লাশ শেষে একান্ত  অবসরে সবাই যখন রেস্টে যায় তখন অনিচ্ছা শর্তেও  প্রাইভেট টিউশনিতে পড়ানো।  ধরে নিলাম প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ হয়ে গেলো।  একজন শিক্ষক স্কুলকলেজে সময় কাটান ৬/৮ ঘন্টা।  আর ১৬/১৮ ঘন্টা থাকেন বাইরে।   নিজস্ব পরিসরে।  তাহলে একজন শিক্ষক স্কুলকলেজ থেকে ফিরে এসময় না পড়িয়ে কি করতে পারেন? নিশ্চিত করে বলা যায়, তখন বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে শিক্ষক তাঁর মেধাকে শিক্ষা ব্যতীত অন্যকোন কাজে ব্যবহার করতে পারেন।  এতে বিদ্যার ধার ধীরে ধীরে কমে যাবার আশংকা রয়েছে। 

সামান্য আয়ে সংসার না চললে অনেক মেধাবী শিক্ষক এই পেশা ছেড়ে দিতে পারেন।  আবার এই পেশার এমন বেহাল দশা দেখে আমাদের আগামীর মেধাবীরা এই পেশায় আসতে নাও চাইতে পারেন।  পৃথিবীর ইতিহাসে কোনদেশের মানুষ গড়ার কারিগররা যদি মেধাবী না হয় তবে মেধাবী উন্নত জাতি আশা করা কেবলই প্রহসন। 

একটু ভেবে দেখুন, স্কুল কলেজে ছাত্ররা কোন ধরণের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়।  নিঃসন্দেহে স্কুলকলেজের সবচেয়ে ভাল মেধাবী শিক্ষকের কাছেই যায়।  যে শিক্ষক ক্লাসে ফাঁকি দিতেন তার কাছে কী আপনি প্রাইভেট পড়তেন? নিশ্চয় নয়।  এক্ষেত্রে জোর করে যদি কেউ পড়িয়ে থাকেন তা নিশ্চয় বেশিদিন স্থায়ী হয় নি।  আর দুই/চার জনের শাস্তি কেন সবাই ভোগ করবে?

এ কথাটি চিন্তা করা জরুরি দেশের বর্তমান সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় অধিকাংশ অভিভাবকই শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া অচল।  আমাদের দেশের প্রায় নামীদামী স্কুলকলেজে প্রতি শাখায় ১০০/১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকে।  ফলে শুধু ক্লাসেই সব সম্পন্ন করা দুরূহ।  এই আইন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকের পাশাপাশি বিপদে পড়তে পারেন শিক্ষার্থীসহ অভিভাবক।  দেশের শিক্ষার হারও কমে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।  "প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ হলে শিক্ষক ভাল পড়াবেন। " এই কথার কোন ভিত্তি নেই।  অধিকন্তু তখন আর্থিক অভাব অনটনে পড়ে শিক্ষকরা ক্লাসে উদাসীন হবার আশংকা থেকে যাচ্ছে।  আর যারা এর সুফল ভাবছেন একবার তাদের অবস্থা ভেবে দেখুন।  তাদের সন্তানরা দেশের খ্যাতনামা কোন স্কুলকলেজে কিংবা দেশের বাইরে পড়ছে।  ভাল শিক্ষককে সুন্দর গাড়ি করে নিয়ে বেশি সম্মানী দিয়ে একান্তে বাসায় প্রাইভেট পড়ান, পড়াচ্ছেন। 

এই আইন  বাস্তবায়িত হলে ধীরে ধীরে পড়াশুনা আবার আগেকার দিনের মতো ধনীসমাজের করায়ত্তে চলে যাবে।  তাহলে সাধারণের কী হবে?  কেউ কি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন- তখন আরো ভাল পড়াশুনা হবে? আর যদি না হয়, তবে গরীব ও অশিক্ষিত কিংবা কম শিক্ষিত অভিভাবকরা কী সন্তানের পড়াশুনা নিয়ে বিপদে পড়তে পারেন না?

একটি বিষয় স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে আমাদের।  আর তা হলো- আমাদের দেশে অদ্যাবধি সরকারি অথবা বেসরকারি যেকোন মেডিকেলে কারা টিকছেন? ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ছে কারা? উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বিদেশে যাচ্ছে কারা?এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর একটাই।  আর তা হলো সমাজের উঁচুস্তরের বাসিন্দাদের সন্তানরা।  আজও দেশের গরীব অসহায় লোকেরা সন্তানের পড়াশুনাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেন।  তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়।  পড়াশুনা শেষে দুবেলা দুমুঠো ডালভাত বাঁচতে পারার মতো একটি চাকরি পাওয়া।  এই আইন বাস্তবায়িত হলে সম্পূর্ণ স্কুলকলেজের পড়াশুনার ওপর গরীবদের নির্ভরশীল থাকতে হবে।  সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে তা দিতে ব্যর্থ হলে গরীবলোকের সন্তানরা লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ার আশংকা থেকে যায়। 

এ বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা করা জরুরি।  কতিপয় শিক্ষকের কালিমা পুরো শিক্ষক জাতির ওপর লেপন করা কী ঠিক হচ্ছে! ইতিমধ্যে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেও এসেছে শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা। 

কোন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেয়া যাবে না।   তবে এ কথা সত্য যে, কিছু শিক্ষক হুশজ্ঞান হারিয়ে আগ্রাসী হয়ে শিক্ষার্থীকে মেরে কাটগড়া পর্যন্ত গেছেন, যাচ্ছেন।  যা গোটা শিক্ষকসমাজের জন্য চরম অসম্মান বয়ে এনেছে।  এ বিষয়ে শিক্ষকসমাজকে আরো সচেতন হতে হবে। 

আমার স্কুলের পাশের একটি  বেসরকারি সারাদিনের স্কুলে প্রায় শিক্ষক নিয়োগে আমাকে যেতে হয়।  গত বছর তিনেক আগে এমনই একটি নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভা নিতে আমি যাই।  আমার যতদূর মনে পড়ে  ঐ নিয়োগ পরীক্ষায় সর্বমোট অংশ নিয়েছিল সতেরো জন।  তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল যে দুইজন করেছিলেন তাদের প্রাথমিকভাবে নিয়োগের চিন্তা করা হয়।   তাদের মধ্যে একজন ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে মাস্টার্স করা।  অন্যজন ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে গণিতে অনার্স সম্পন্নকারী। 
তাদের সাথে আমার প্রশ্নত্তোর পর্বের পর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মহোদয় বেতন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।  সবশেষে মাত্র ৩০০০ টাকা বেতনে নিয়োগ পান তারা।  এরপর সেই স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান-২০১৭ তে বিশেষ অতিথি হিসেবে গেলে শেষবার তাদের সাথে আমার কথোপকথন হয়।  তাদের হাসিমাখা মুখ দেখে আমার মনে কৌতূহল জাগে।  এই সামান্য বেতনে উনারা চলেন কিভাবে? এক পর্যায়ে আমি তাদের একজনকে বেশ কিছু প্রশ্ন করি। 

নিচে সেই কথোপকথনটি সবার সামনে তুলে ধরা হলো :

শিক্ষক : স্যার, আসসালামু আলাইকুম।  কেমন আছেন?
আমি : ওয়ালাইকুম আসসালাম।  আলহামদুলিল্লাহ ভাল।  তো আপনারা কেমন আছেন?
শিক্ষক : আলহামদুলিল্লাহ আমরাও ভাল আছি। 
আমি : এখানে চাকরি কেমন লাগছে?
শিক্ষক : ভাল লাগছে। 
হঠাৎ আমার মনে তাদের স্বল্প বেতন প্রাপ্তির  বিষয়টি এসে গেল।  কিছুক্ষণ নীরবে ভাবলাম।  আজকের সমাজে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য বেতনে কিভাবে চলেন তারা। 
তারপর নীরবতা ভেঙ্গে আবার জিজ্ঞেস করলাম,

আমি : আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না।  একটা বিষয় খুব জানতে ইচ্ছে করছে। 
শিক্ষক : জ্বী স্যার, বলুন। 
আমি : আপনাদের স্যালারি এখন কতো?
শিক্ষক : জ্বী, সব মিলিয়ে ৩৯০০ টাকা পাই। 
আমি : এই সামান্য বেতনে চলেন কীভাবে!
শিক্ষক : সিঙ্গেল একটি রুম ভাড়া নিয়েছি। 
আমার একমাত্র ছেলেকে প্লে তে ভর্তি করিয়েছি।  এই টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া আর ছেলের স্কুলের বেতন হয়। 
আমি : কী বলেন! তাহলে খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসা খরচসহ যাবতীয়?
মৃদু হেসে তিনি বললেন, : স্যার, আল্লাহ রহমতে খেয়ে পরে সম্মানের সাথে ভালই আছি।  সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত স্কুলে ক্লাস থাকে।  তারপর লাঞ্চ সেরে টিউশনির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।  রোজ বাসায় ফিরি এগারোটার দিকে।  ইদানিং জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে টিকে থাকতে পারছি না।  শিক্ষক বলে কথা।  স্কুলেও আসতে হবে সুন্দর-পরিপাটি হয়ে।  তাই সকালে স্কুলে আসার আগে ছয়টা থেকে সাতটায় একটা ব্যাচ পড়াই। 

এভাবে চলে যাচ্ছে দিন।  এখন একটাই আশা নিজে যা পারিনি তা ছেলেকে দিয়ে পূরণ করবো।  কষ্ট করে হলেও ওকে আমি মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবো।  ওই হবে আমার শেষজীবনের ভরসা। 
আমি : আর আপনার বাবা-মা?

আমার এমন প্রশ্নে তিনি বিষন্ন হয়ে বেশ কিছু সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।  আমি লক্ষ্য করলাম তার চোখেমুখে হঠাৎ করে ব্যর্থতার শতভাগ ফুটে উঠেছে।  যে লোকটা শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন।  তার এমন কষ্ট আমাকে খুব ব্যথিত করলো। 
তারপর আদ্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
আমি : কী, কিছু বলছেন না যে?

শিক্ষক : জ্বী, আমার আব্বা-আম্মা আমাকে নিয়ে অনেক আশা করেছিলেন।  আমাকে বিজ্ঞান শাখায় পড়িয়েছেন।  বাবার আশা ছিল আমাকে ডাক্তার হিসেবে দেখবেন।  কিন্তু আমার কিছু ব্যর্থতা আর বাবা-মার আর্থিক অবস্থা এর সামনে বাঁধা হয়ে এলো।  এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয় নিয়ে অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করি।  পাস করার পর সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিই।  বেশ কিছু পরীক্ষায় ভাইভা পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হই।  কিন্তু একবারও এ পর্ব অতিক্রম করতে পারিনি।  মাত্র একটি ইন্টারভিউর ভাইতে সরাসরি বলেছিল, চাকরি হবে যদি  পাঁচ লাখ টাকা উপরি হিসেবে উনাদের দিই। 

যেখানে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতেই দিনরাত সংগ্রাম করতে হয় সেখানে উপরি হিসেবে কাউকে পাঁচ লাখ টাকার কথা ভাবাই যায় না।  সবশেষে যখন চরম হতাশার সাগরে হাবুডাবু খাচ্ছিলাম তখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ধরা দিল এই স্কুলটি।  এই স্কুলে তেমন বেতন না পেলেও আমার অবসর সময়টা টিউশনি করে কোনমতে কঠিন এই শহরে আজও বেঁচে আছি।  আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা আমার প্রিয় বাবা-মার মনের কোন আশাই আমি পূরণ করতে পারিনি।   আমার দুঃখিনী মা আজও আশায় বুক বাঁধেন।  আমার একটা ভাল চাকরি হবে।  শত কষ্টের মাঝে প্রতি মাসে না পারলেও দুই তিন মাস পরপর কিছু টাকা পাঠানোর চেষ্টা করি। 
স্যার, আমি যে টাকা পাঠাই তা তাঁদের প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত কম।  শুনেছি বর্ষা মৌসুমে আমাদের ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ে।  ইচ্ছে করে তাঁদের একটু সুখের জন্য কিছু করি।  কিন্তু পারি না। 

এই কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আবেগী হয়ে দুচোখের জল ছেড়ে দিলেন। 
এতক্ষণ তার কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলাম।  তার জীবনের বাস্তবচিত্রকে ভাবতেই আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।  তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বললাম,

অধৈর্য হবেন না।  জীবনে চলার পথে মানুষকে এমন সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়।  যারা এই সংগ্রামকে ভয় পেয়ে পিছু হটেন তারাই জীবমযুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন।  এ পৃথিবী তাদের স্মরণে রাখে না।  আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই।  ইতোমধ্যে আপনার কথা আমি পরিচালক মহোদয়ের কাছ থেকে শুনেছি।  আপনি হলেন ছোট স্কুলের বড় মাস্টার।  এমন পরিশ্রমীরা যেকোন শাখায় যেকোন সময় সফল হতে পারেন। 

আমাদের আলাপচারিতার এক পর্যায়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। 

অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরতে রাত  প্রায় নয়টা বেজে যায়।  সারারাত ছটফট করেছি।  চোখে কেন জানি ঘুম আসছিল না।  মাথায় ঘুরেফিরে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল।  দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক এতো কষ্টে আছেন!

আজ  সাত মাস পর যখন শিক্ষা আইনে সেই প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তখন পুরো জাতি বিস্মিত হয়।  রাজনীতিবিদ রাজনীতির চর্চা করবেন সারাবছর।  তিনি যদি শুধু নির্বাচনকালীন রাজনীতির চর্চা করেন তবে জাতির কপালে নিশ্চিত দুঃখ থাকবে।  একজন শিল্পী শুধু কী মঞ্চে গান করেন? নাকি আগে বারবার প্র্যাকটিস করেন। 

ঠিক একইভাবে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে অবসর সময়ে প্রাইভেট টিউশনি করে একটু  ভাল চললে সমাজের বৈষম্য কী হ্রাস পায় না? ভাবতে অবাক লাগে।  পৃথিবীর উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতে যেখানে শিক্ষকের বেতনভাতা থাকে সর্বোচ্চ।  সেখানে আমাদের বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র।  কারণে অকারণে এখানে শিক্ষা পদ্ধতি পাল্টে।  ক্ষমতার রদবদল হলে পাঠ্যপুস্তক পাল্টে।  পাশাপাশি পাল্টে দেশের উন্নয়নমূলক ভাবনা।  গুটিকয়েক অভিভাবকের আন্দোলনে শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করা বড় কোন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত করে।  প্রয়োজনে এ বিষয়ে বিজ্ঞমহলের পরামর্শ গ্রহণের পাশাপাশি  সারাদেশের অভিভাবকদের মতামত জানা প্রয়োজন।  কেননা শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করা হলেও দেশের ধনীসমাজ ঠিকই সেই সব ভাল মেধাবী শিক্ষকদের খুঁজে নেবেন। 

শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করা হলেও সব ঠিক হয়ে যাবে।  শিক্ষকরা ক্লাসে বেশি মনোযোগ দেবেন।  এ কথা গুটিকয়েকের ধারণা হতে পারে।  একদিকে যেমন শিক্ষকদের মানবেতর জীবন যাপন করার আশংকা থাকছে।  অন্যদিকে ধনীসম্প্রদায় তাঁদের ছেলেমেয়েদের ভাল ফলাফল নিশ্চিত করতে অধিক অর্থ ব্যয় করে শিক্ষকদের বাসায় নিতে পারেন।  এখন যেখানে একজন শিক্ষক বাসায় গিয়ে পড়িয়ে মাসে ৪০০০/৫০০০ টাকা সম্মানী পান।  তখন হয়তো শিক্ষকের  মাসিক সম্মানী ১০০০০/১২০০০ হয়ে যেতে পারে।  এখন তো গরীব হলেও মাসিক ৫০০/৭০০ টাকা সম্মানী দিয়ে নিজের সন্তানকে সুশিক্ষিত করার সাহস করেন।  তখন খুব সম্ভত এই সুযোগ আর থাকবে না।  ফলে গরীব মেধাবীদের জন্য বিদ্যমান মেধাবৃত্তিও ধনীর সন্তানরা পেয়ে যাবে। 

যার বাবার টাকা পয়সা বেশি থাকবে সেই মেধাবী হবে।  পড়াশুনায় নিয়মিত হবে।  অপরদিকে গরীবলোকের ছেলেমেয়েরা যথাযথ নার্সিং এর অভাবে ধীরে ধীরে পড়াশুনা থেকে ছিটকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।   যার মানে শিক্ষা শুধু ধনীসমাজে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।  অথচ দেশের সিংহভাগ মানুষ নিম্নমধ্যবৃত্ত।  এদের বাদ দিয়ে সার্বিক উন্নতি আশা করা চোরাবালিতে বসতি স্থাপনের সমতুল্য। 

পরিশেষে, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারণকারীদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ, শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ না করে কিভাবে তাঁদের পাঠদানে সক্রিয় করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিন।  এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান, মনিটরিং টিম অথবা পরিচালনা পরিষদের ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  কারো স্বার্থে, কারো মিথ্যে প্ররোচনায় জাতি ধ্বংসকারী কোন পদক্ষেপ নেবেন না।   শিক্ষাকে সার্বজনীন করতে কাজ করুন।