৭:১৬ পিএম, ১৮ জুন ২০১৮, সোমবার | | ৪ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

দ্বিপক্ষীয় সংলাপ সফল করতে বৈশ্বিক চাপ চাইবে বাংলাদেশ

১২ নভেম্বর ২০১৭, ০৯:০১ এএম | মুন্না


এসএনএন২৪.কম : রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চলতি নভেম্বর মাসজুড়ে নানা তৎপরতা শুরু হতে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ সফর ও বহুপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।  এসব তৎপরতা চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারের আহ্বান জানানো হবে।  বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে মনে হলেও আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া সফল হওয়া সম্ভব নয়।  মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে আন্তরিক নয়।  ১৫ নভেম্বর কয়েক ঘণ্টার সফরে মিয়ানমার যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। 

তারপর ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।  এছাড়াও ২০ ও ২১ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে অনুষ্ঠিত হবে ‘এশিয়া-ইউরোপ মিটিং’ (আসেম)।  চলতি মাসের শেষে অর্থাৎ ২৯ নভেম্বর মিয়ানমার ও ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন পোপ ফ্রান্সিস।  এসব সফর ও বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নানা তৎপরতা আশা করা হচ্ছে।  যদিও এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে কতটা আগ্রহী করা যাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। 

ঢাকার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করছে বলেই মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলছে।  আগে তারা আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথাই বলত না।  ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক চাপ থেমে গেলে মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু ভুলে যাবে।  আমরা চাই, সংকটের যৌক্তিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকুক। 

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উইয়ের আসন্ন ঢাকা সফর নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।  রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে চীন।  ফলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে কী ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আসছেন সে ব্যাপারে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।  চীন বরাবরই রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ইস্যু বলে মন্তব্য করেছে।  বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের এ অবস্থানে ঢাকা অনেকটাই হতাশ।  সম্প্রতি মার্কিন কোম্পানি শেভরনকে অনেকটা ছাড় দিয়ে চীনের কোম্পানির কাছে বিক্রি বন্ধ করেছে বাংলাদেশ।  চীনের হিমালয়ান নামের একটি কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশে শেভরনের অংশ কেনার আলোচনা চূড়ান্ত করেছিল।  কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের মধ্যে অনেকটা আকস্মিক ঘোষণা আসে যে, শেভরন বাংলাদেশ ছাড়ছে না। 

রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র।  সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি থমাস শ্যানন ঢাকায় এমন মন্তব্য করেছেন।  তবে মার্কিন কর্মকর্তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আশঙ্কা এখনও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।  এ বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার সফরে নেপিদো যাচ্ছেন টিলারসন।  কূটনৈতিক উপায়ে সংকট নিরসনের চেষ্টা টিলারসনের সফরে করা হতে পারে।  যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।  এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছে যে, রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ বাড়ি ও জমিতে ফিরে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।  এছাড়া বিদেশি সাহায্য কর্মী ও গণমাধ্যমকে রাখাইন রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।  মিয়ানমারের বেসামরিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।  ফলে এসব বার্তাই টিলারসন মিয়ানমারের নেতাদের দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।  টিলারসনের সফরের প্রতি ঢাকার বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। 

পোপ ফ্রান্সিসের আসন্ন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতা প্যাট্রিক ডি’রোজারিও শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পোপ কী বলবেন সেটা এখনও আমরা জানি না।  তিনি সার্বিকভাবে বিষয়টিকে দেখছেন।  তিনি নিশ্চয়ই শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করবেন।  মানুষকে হত্যা করা, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া এবং নিশ্চিহ্ন করাকে সায় দেবেন না। 

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ১৯ নভেম্বর আসেমে যোগ দিতে মিয়ানমার যাচ্ছেন।  তবে আসেম সম্মেলনের আগে ১৬ ও ১৭ নভেম্বর দ্বিপক্ষীয় সফরে তাকে মিয়ানমার যাওয়ার জন্য অং সান সু চি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।  তবে ঢাকায় চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফর থাকায় মাহমুদ আলী এ সময় মিয়ানমার যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।  আসেম সম্মেলনের পর ২১ ও ২২ নভেম্বর তিনি দ্বিপক্ষীয় সফরে মিয়ানমার অবস্থান করবেন। 

মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানের ইস্যু গুরুত্ব পাবে।  বিশেষ করে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রতি জোর দেয়া হবে।  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য দূর করার বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে।  মিয়ানমার ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহ দেখিয়েছে।  বাংলাদেশ নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অন্তর্ভুক্তি চেয়েছে। 

কর্মকর্তারা বলছেন, আসেম সম্মেলনের এজেন্ডায় রোহিঙ্গা ইস্যু অন্তর্ভুক্ত নয়।  তবে এশিয়া ও ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে সাইডলাইনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এ ইস্যু তুলতে পারেন।  বাংলাদেশের লক্ষ্য হল, আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে রাজি করানো।  আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার রাজি নয়। 

এদিকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন।  তার আগের দিন দিল্লিতে ৭৬ জন বিদেশি রাষ্ট্রদূতকে এ সংকটের বিষয়ে অবহিত করেন তিনি।  ঢাকায় যেসব দেশের দূতাবাস নেই সেসব দেশের রাষ্ট্রদূতরা দিল্লিতে থেকেই বাংলাদেশের বিষয় দেখাশোনা করেন।  এসব দূতকেই তিনি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি অবহিত করে এ বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ দেয়ার আহ্বান জানান।