৫:২৫ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার | | ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

সেকায়েপ প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরেই শেষ

৫ মাস ধরে বেতন বন্ধ, শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপন

১৮ নভেম্বর ২০১৭, ১১:০৬ পিএম | সাদি


মোঃ আমজাদ হোসেন, ভোলা প্রতিনিধি : "গুণগত শিক্ষা উন্নত জীবন" এই স্লোগান বুকে ধারন করে বাংলাদেশের  ৬৪ জেলার প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় প্রায়  ৬০০০(ছয় হাজার) অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষক( এসিটি) ছাত্র- ছাত্রীদের গুণগত শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন করে চলেছেন সেই সাথে করিয়েছেন মাধ্যমিক স্তরে দেশের অভূতপূর্ব সাফল্য আজ সেই সকল অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষকরা খেয়ে না খেয়ে নানা রকম রোগ শোকের ভার কাঁধে বহন করে পরিবার পরিজনদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।  এরা দেশের নামি দামি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান,গনিত এবং ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করা মেধাবী শিক্ষক। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) এর আওতায় এসব অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষকদের (এসিটি) মেয়াদ শেষ হতে চলছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। 

সেই সাথে গত ৫ মাস ধরে এসব শিক্ষকরা পাচ্ছে না বেতন।  এতে হতাশা আর দারিদ্রতায় পড়েছেন প্রকল্পে কর্মরত  সারা দেশের ৬০০০ শিক্ষক।  চাকুরিতে স্থায়ীকরণ ও বকেয়া বেতনের দাবীতে সারা দেশের ৬ হাজার শিক্ষকরা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাবার অপেক্ষায় আছে। 

সেকায়েপ শিক্ষকদের সংগঠন বিভিন্ন এটিসি অ্যাসোসিয়েশন জানায়, ২০১৪ সালের শেষ দিকে দেশের ৬৪টি জেলার ৬৪টি উপজেলায় এ প্রকল্পের আওয়তায় সারা দেশে ৬ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়।  এসব শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ৬৪ জেলার ৬৪ দুর্গম উপজেলার স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজইয়েটের মাধ্যমিক পর্যায়ে। খুব কম শিক্ষকই নিজ নিজ উপজেলায় নিয়োগ পেয়েছেন আর বাকিরা প্রথম প্রথম বাড়ি থেকে ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পড়াতে গিয়েছেন এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানে অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে তারা পাঠদান করে আসছেন।  তাদের নিয়মিত ক্লাস ছাড়াও অতিরিক্ত আরও ১৬টি ক্লাস নিতে হচ্ছে। 

প্রকল্পের এসব শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী, অনেকে বিএড ও এমএম পাশ করেছেন।  স্কুল বা মাদ্রাসায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কষ্ট ও সময় অপচয় হচ্ছে বিধায় তারা রুম ভাড়া নিয়ে তিনবেলা হোটেলে খেয়ে নিজেদের সবটুকু অর্জন দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিলিয়েছেন অথচ আজ দীর্ঘ ৫ মাস বেতন না পেয়ে পাওনাদারদের খারাপ কথা শুনতে হচ্ছে।  কয়েকজন শিক্ষকদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে কথা বলতে যেয়ে তাদের দুচোখ জুড়ে কান্নার ঝরনা টুকুই দেখেছি যা হাজার বছর ধরে দুর্ভিক্ষপীড়িত অবুঝ শিশুর কচি মুখ খানার চিত্র।  তাদের শুধু একটায় কথা ভাই পাওদারদের আর কতো তারিখ দেয়া যায়।  খাবার টাকাতো না বললাম একেকজনের রুম ভাড়া পুরো পাঁচ মাস বাকি। বেতন ছাড়া আর কোন মতেই পারছিনা। 

একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেল একই কথা, তারা বলেন-আমার স্কুলে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা বেশি শিক্ষক সংকট তাছাড়া বিষয় ভিত্তিক গুনগত শিক্ষক না থাকার কারনে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী স্কুলেই আসতনা।  সেকায়েপে চাহিদা দেবার পর তিনজন গনিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের শিক্ষক পেয়েছি।  এসব শিক্ষকরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ঝরে পড়া ও স্কুল বিমুখী শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়েছেন।  ফলে আমাদের স্কুলের রেজাল্ট আগের তুলনায় ফলদায়ক।  এসব শিক্ষকরা স্কুলে আসাতেই মনোবল বেড়েছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের, ক্লাসের একেবারে পেঁছনে চুপটি করে বসে থাকা দুর্বল ছেলেটির এবং অভিভাবকের। 

কেউ কেউ আবার বলছেন আমাদের সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়স পাড় হয়ে গেছে আবার কেউ কেউ বিয়ে করেছেন আছে সন্তানও, এমতাবস্হায় চাকুরী হারালে বেকারত্বের ঘানি টানা ছাড়া এদের আর কোন উপায় থাকবেনা।  ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের নিয়োগ দেয়ার পর থেকে এ শিক্ষকের অভাব আমার প্রতিষ্ঠানে নেই।  এ তিন শিক্ষক বিষয় ভিত্তিক ছাড়াও সৃজনশীল মেধা বিকাশে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করছেন।  সেকায়েপ শিক্ষকদের প্রকল্প শেষ হলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনকে বিপদে পড়েতে হবে বলেও তারা জানান। সেকায়েপ শিক্ষকদের সংগঠন এসিটি অ্যাসোসিয়েশন কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য সচিব ও বরিশাল জেলা শাখার এহসান আহম্মেদ বলেন দেশের ৬২টি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দিয়ে উপকৃত। 

এ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার শতভাগ সফল হয়েছে।  আমারা বিষয় ভিত্তিক ছাড়াও ১৬টি ক্লাসসহ নানাবিধ শিক্ষা সংক্রান্ত কাজ করি।  গরীব শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিনামূলে আলাদাভাবে আমারা পাঠদান করি।  এ শিক্ষক নিয়োগের পর শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধ হয়েছে।  মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে সেকায়েপ শিক্ষকদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

যে সসব প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়ার ক্লাস হতোনা সেখানেও এই সেকায়েপ প্রকল্পের শিক্ষকরাই তা চালু করেন।  বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী মেধাবীরা এ প্রকল্পের শিক্ষক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে তারা আধুনিক শিক্ষা দিয়ে আসছেন।  বিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়েও রাখছে অবদান।  এই প্রকল্পের সাথে জড়িত অন্যান্য শিক্ষকরা বলেন গত ৫ মাস ধরে আমরা বেতন ভাতা না পেয়ে চরমভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছি।  সেই সাথে এ বছর (২০১৭) ডিসেম্বর মাসে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।  ফলে দেশের ছ’হাজার শিক্ষকের চরম দারিদ্রতার সাথে হাতাশায় কাটছে দিন। 

এদিকে সেকায়েপ শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও বকেয়া ভাতার দাবীতে এ শিক্ষকদের কেন্দ্রিয় সংগঠন এসিটি অ্যাসোসিয়েশন দেশব্যাপি নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছে।  গত ১৪ নভেম্বর এ সংক্রান্ত একটি স্মারকলিপি ৬২ জেলা থেকে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। 

ঝালকাঠি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রাণ গোপাল দে যিনি আগে ভোলা জেলায় শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন এ ব্যপারে তিনি  বলেন, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষকের যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে।  সেকায়েপের এ প্রকল্পে অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারা নি:সন্দেহে মেধাবী ও তরুণ।  যার প্রমাণ আমি নিজেই, তিনি বলেন আমি যখন ভোলাতে ছিলাম তখন কয়েকদিন ভোলা টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জেলার বিভিন্ন স্কুল মাদ্রাসার বিজ্ঞান শিক্ষকদের  "হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষা" শীর্ষক ৬ দিন ব্যাপি ডেমো ক্লাসে আমি উপস্হিত ছিলাম।  সেখানে বিজ্ঞানেরর কিছু এসিটি উক্ত প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল তখন আমি এসব এসিটিদের ক্লাস নেবার কৌশল, বিষয় ভিত্তিক টুকি টাকি জ্ঞান ছাড়াও দেশ এবং দেশের বাইরের কোন দেশে তার কোন প্রজাতি( প্রাণীর ক্ষেত্রে), স্হানীয় নাম ,ইংরেজী নাম এবং বৈজ্ঞানিক নাম উল্ল্যেখ করেছেন যা অন্য সব বয়স্ক শিক্ষকরা দিতে পারেননি, আমি মনে করি এরা দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য নিশ্চয় রসাল ফলদার বৃক্ষের সমান। 

এদের প্রকল্পভূক্ত না করে সরাসরি নিয়োগ দিয়ে এমপিওভূক্ত করে নিলে প্রতিষ্ঠান আরও উপকৃত হবে বলেও জানান এ সিনিয়র জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে এসিটি অ্যাসোসিয়েশন জাতীয় সংসদের কয়েকজন সাংসদ এমনকি শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে চাকুরী স্হায়ী করণের ব্যাপারে স্মারকলিপি দিয়েছেন।  এখন শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদিচ্ছা।  তিঁনি চাইলে এই ৬ হাজার শিক্ষক তাদের পরিবার পরিজন এমনকি বৃদ্ধ মা বাবাকে সাথে নিয়ে একটু সুখের হাঁসি হাঁসতে পারেন।