৫:১৫ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার | | ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ময়মনসিংহ-২ ফুলপুর তারাকান্দা আসনের নির্বাচনী প্রার্থীবৃন্দ

৩০ নভেম্বর ২০১৭, ০৫:৩৫ পিএম | মুন্না


মিজানুর রহমান, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ময়মনসিংহের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-২ আসন।  ফুলপুর ও তারাকান্দা আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের শামসুল হক, ১৯৭৯ সালে ইসলামী ঐক্যের ইসমাইল হোসেন তালুকদার, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের শামসুল হক, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের হায়াতুর রহমান খান ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের শরীফ আহমেদ এমপি নির্বাচিত হন।  এই আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। 

আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম এম শামছুল হক এ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।  এখানে আওয়ামী লীগে গ্রুপিং থাকলেও দলের স্বার্থে ঐক্যের জায়গাটি সুসংহত করার নজির রয়েছে।  দলীয় ঐক্যের পথ ধরে আসনটি আগামীদিনেও আওয়ামী লীগের কব্জায় থাকবে বলে তারা মনে করেন।  অপরদিকে গ্রুপিং কোন্দলের কারণে সুবিধা করতে পারছে না বিএনপি। 

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন মরহুম শামছুল হকের ছেলে শরীফ আহমেদ।  এমপি হওয়ার পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রবীণ কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।  এদিকে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাকর্মীরা ছোট ছোট দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে সাবেক এমপি হায়াতুর রহমান খান বেলাল, তারাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক, ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। 

অপরদিকে বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার, ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তারাকান্দা উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফুলপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাসার আকন্দসহ কয়েকজন নেতা দলীয় কার্যক্রম পৃথক পৃথকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।  নেতাদের কারণে বিভক্ত কর্মী-সমর্থকরাও।  মোতাহার হোসেন তালুকদার ও আবুল বাসার আকন্দ আন্দোলন করতে গিয়ে বিস্ফোরক মামলার আসামি হয়েছেন।  মামলা হামলার কারণে অনেকটা কোণঠাসা দলটি। 

ময়মনসিংহ-২ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন, বর্তমান এমপি ফুলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শরীফ আহমেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সাবেক এমপি হায়াতুর রহমান খান বেলাল, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ, তারাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ বারের দুবার নির্বাচিত সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক, ময়মনসিংহ জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. আলতাফ উদ্দিন ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম ফেরদৌস জিলু। 

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার, ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফুলপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ, ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তারাকান্দা উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ এনায়েতউর রহমান, ও ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সুজাউদ্দৌলা সুজা। 

সম্ভাব্য এসব প্রার্থী তৃণমূলে গণসংযোগের পাশাপাশি মনোনয়নের আশায় কেন্দ্রে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।  বীর মুক্তিযোদ্ধা, পাঁচবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও একবার নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম এম. শামছুল হকের জ্যেষ্ঠ পুত্র শরীফ আহমেদ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন।  তিনি বর্তমানে ফুলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  তিনি আওয়ামী লীগ থেকে এবারো মনোনয়ন চাইবেন।  দলীয় বিশৃঙ্খলা নিরসন করে সুষ্ঠু নির্বাচনে আবারো এমপি হবেন বলে তিনি আশা করেন। 

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী সুপরিচিত নেতা হিসেবে ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন হায়াতুর রহমান খান বেলাল।  এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ২০১৪ সালে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে যান।  ইদানীং নির্বাচনী আলোচনায় নৌকা মার্কায় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি।  দলীয় মনোনয়ন পেলে সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি আবারো এমপি হবেন বলে তার দৃঢ়বিশ্বাস। 

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তারাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, অ্যাডভোকেট ফজলুল হক আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে।  ইতিপূর্বে দুবার মনোনয়ন চেয়ে পাননি।  ১৯৯০ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আনারস মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়ার পর তিনি আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি।   রাজনৈতিক মামলার শিকার অসংখ্য দলীয় নেতাকর্মীকে বিনা খরচে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন।  দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে।  নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন বলে কর্মীরা জানান। 

সদালাপী হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রথম দিকে খুবই মজবুত অবস্থানে থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বঞ্চিত হন।  তবু তিনি হাল ছাড়েননি।  মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দীর্ঘদিন ধরে ফুলপুর ও তারাকান্দার প্রত্যন্ত পল্লীতে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।  তিনি ২০টি ইউনিয়নের প্রতিটি হাট-বাজার, মসজিদ, মাদরাসা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নৌকার পক্ষে জনমত গঠনের প্রয়াস চালাচ্ছেন। 

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নরত অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীকে নিয়মিত মাসিক বৃত্তি প্রদান করছেন।  মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন।  এ আসনে আওয়ামী লীগের আরেক প্রার্থী ময়মনসিংহ জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ফুলপুরের সন্তান মো. আফতাফ উদ্দিন এবারও মনোনয়ন চাইবেন। 

তিনি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে অবসর নিয়েছেন।  চাকরিকালীন ২২ বছর সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বি-২০২ এর ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি ছিলেন।  ১৯৭১ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন।  তিনি অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।  মো. আফতাফ উদ্দিন বলেছেন  তিনি এলাকায় গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। 

ফুলপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে ফুলপুরে বিএনপির সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।  আশরাফ উদ্দিন সরকারের আকস্মিক মৃত্যুতে জাতীয় পার্টির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব থেকে ২০০১ সালে বিএনপিতে যোগদান করে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ শহীদ সারোয়ার। 

ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুবার নির্বাচিত এমপি শামছুল হককে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন তিনি।  ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা হায়াতুর রহমানের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন তিনি। 

এরপর স্থানীয় বিএনপি ও তার সঙ্গে যোগ দেয়া জাতীয় পার্টির কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ায় কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি।  আগামী নির্বাচনে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে তার আত্মবিশ্বাস।  তিনি বলেন, এ আসনে বিএনপিতে কোনো গ্রুপিং নেই।  বিএনপির যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন তাদের মধ্যে যেই মনোনয়ন পাবে আমরা তার পক্ষে আমরা কাজ করবো।   উপজেলা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে তার প্রমাণ মিলেছে।  বিএনপি অধিকাংশ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। 

১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ।  এ নির্বাচনে বিজয়ী হলেও সংসদ ভেঙে দেয়ার কারণে বেশি দিন টিকতে পারেননি তিনি।  গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে ফুলপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ।  তিনিও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। 

সাবেক ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতা বর্তমান ময়মনসিংহ (উ.) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তারাকান্দা উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার রাজপথের লড়াকু সৈনিক।  ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বৈরিতা আর দলীয় অনৈক্যের কারণে তিনি সুবিধা করে উঠতে পারছেন না।  ইতিপূর্বে চারবার প্রার্থী হয়েও জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি তিনি। 

কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে বারবার মনোনয়ন বঞ্চিত হলেও কখনো বিদ্রোহী হিসেবে অবস্থান নেননি।  মামলা-হামলা শিকার হয়েও দলের প্রতিটা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন।  এবারো মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনি।  ফুলপুর-তারাকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ এনায়েতউর রহমানও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।  চরম দুর্দিনে ফুলপুর-তারাকান্দা নেতৃত্ব সংকটের সময় তিনি দলের হাল ধরেছিলেন। 

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সুজাউদ্দৌলা সুজা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগসহ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।  তিনি এবার বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। 

ফুলপুর পৌরসভার গত নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া ঢাকা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এম এইচ ইউসুফ নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যে গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন।  জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এলাকায় চমক সৃষ্টি করতে চান তিনি। 

প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দান-অনুদান দিয়ে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছেন ইউসুফ।