১১:২৮ পিএম, ১৮ জানুয়ারী ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

এন্টিবায়োটিক সচেতনতা ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:১২ এএম | মুন্না


এসএনএন২৪.কম : কেবল বিজ্ঞাপন নয়! প্রদর্শনীও নয়! প্রকৃত ও নীতিগত অর্থে কাজ বাস্তবে পরিণত হওয়া চাই।  যাতে প্রকৃতই মানব জাতির কল্যাণ হয়!

সম্প্রতি ২২ নভেম্বর সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সপ্তাহ পালন করা হয়েছে।  একই সাথে রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগেও এ সপ্তাহ পালন করতে দেখা গেছে।  এটি জাতীয় স্বার্থে আসলেই খুব একটা জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

কিন্তু দুঃখজনক এবং অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা খুবই নাজুক ও হতাশা ব্যঞ্জক।  সেটা আমাদের সবারই জানা আছে।  আমাদের মফস্বল এলাকার সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরগুলো কেবল সীল বা লেবেলে পরিণত হয়ে আছে।  তাই প্রশ্ন জাগে এটি কি শুধু বিশ্বস্বীকৃত একটি দিবস হিসেবে হাজার টাকা ব্যয়ে রঙিন ব্যানারে কেবল প্রদর্শনীর আয়োজন করা? নাকি প্রকৃত অর্থে নৈতিক ও আদর্শগত দায়িত্ব নিয়ে কাজে নেমে পড়া? সেটিই হলো প্রশ্নের বিষয়!

কেন না, দেশের সরকারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অবস্থা দেখলে মনে হয় না যে, আসলেই আমরা আদর্শগতভাবে স্বাস্থ্য সচেতনতায় এমন কাজ ও উদ্যোগ পালন করছি।  বিশেষ করে উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগের অবস্থা দেখেই বলা যায়। 

আমরা জানি দেশে এখন প্রানঘাটি রোগের প্রকৌপ চলছে।  একটু অসুখ হলেই পরীক্ষা করে ধরা পড়ছে ক্যান্সার! এছাড়া প্রেসার, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিস তো এখন সকলের জন্য কমন রোগ।  কিন্তু প্রতিজনে কেন এই ক্যান্সার? কেন এই অস্বাভাাবিক হৃদরোগ ও প্রেসার? স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা জগতে সেটা কি আমরা কখনো অনুধাবন করে দেখছি?

পার্বত্য চট্টগ্রামে জনস্বাস্থ্য ও রোগের উপর দৃষ্টি রেখে (যদিও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নাই) আমি দেখেছি যে, সেখানে প্রায় ২০০০ সালের পর হতে স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ মারা যাচ্ছে খুবই কম।  অধিকাংশ, বলতে গেলে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে অপরিচিত মহামারী রোগে।  যাকে আমরা ধরে নিচ্ছি ক্যান্সার।  চিকিৎসকরাও বলছে তাই!

কথা হলো এ ক্যান্সার কেন? প্রত্যেকের শরীরে কোন না কোন অনিয়ন্ত্রিত, অনিরাময়যোগ্য রোগ কেন? নিশ্চয়ই নিঃসন্দেহে আমাদের শরীর থেকে ধংস হয়ে যাচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা! বিভিন্ন কারণে দুর্বল ও ধংস হয়ে পড়ছে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম।  ফলে আমরা আর পারছিনা সুস্থ থাকতে।  কিন্তু প্রশ্ন হলো এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতা ও হ্রাস কেন? এর পেছনের কারণগুলো কি হতে পারে? সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে এসব খতিয়ে দেখা দরকার আমাদের। 

আমরা জানি দৈনন্দিন ভোগ্য পণ্যের সাথে ফরমালিনসহ মিশ্রণ করা হচ্ছে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের।  এসব ভোগ্যপণ্য ব্যবহারে আমরা জীবনীশক্তি তো হারিয়েই ফেলছি।  উপরন্তু অযাচিত, অযৌক্তিক এবং অপরিমিতভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে শরীর থেকে হ্রাস হতে চলছে আমাদের জীবনীশক্তি আরও বহুগুণে।  এটা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।  তাই তো হতে পারে আমাদের ক্যান্সারের মাত্রা অধিক বেড়েই চলা। 

সবচেয়ে উৎকন্ঠার বিষয় হলো এখন এন্টিবায়োটিক ওষুধেও কাজ করছে না রোগীদের।  তাহলে দেখুন স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও নিরাপত্তা কি আছে!

দেশের উপজেলাগুলোতে যেসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে।  সেগুলোতে থাকেন না নিয়মিত কোন ডাক্তার।  ফলে রোগীরা নির্ভরশীল কেবল গ্রাম্য ডাক্তারদের উপর।  এসব গ্রাম্য ডাক্তাররাই হচ্ছে রোগীদের বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও উপরওয়ালা।  উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদের প্রত্যেক হাট বাজারে এসব গ্রাম্য উপরওয়ালার সন্ধান দেখা যায়।  ক্ষেত্র বিশেষে জনবহুল লোকালয়েও এদের দেখা মেলে।  যাদের গ্রাম্য ডাক্তারের সনদ মাত্রও নেই।  এরা রোগীদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এন্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন প্রয়োগ করে থাকেন এবং অনেক সময় ডাবল এন্টিবায়োটিকও প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায় সচেতন শিক্ষিত মহলের কাছ থেকে।  যেহেতু এন্টিবায়োটিকের ক্ষতিকারক সম্পর্কে তারা জানেনা কিছুই।  তার উপর ব্যবসার দিকটাও চিন্তা করতে হয় তাদের। 

কিন্তু এসব তথ্য থেকে কি তাদের সরাসরি দোষারোপ ও হস্তক্ষেপ করা যায়? তাদের যতটুকু জ্ঞান আছে তা প্রয়োগ করেই তো তারা যথা সম্ভব রোগীদের সেবা দিতে চেষ্টা করে থাকেন।  নিতান্তই যদি কর্মস্থলে ডাক্তার না থাকেন তাহলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাদের করার কি আছে? রোগীরা তো আসছেন তাদের কাছে।  ডাক্তার থেকেও যদি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন উপেক্ষা করে তারা তাদের মত চিকিৎসা চালিয়ে যেতেন, তবেই তো তাদেরকে সরাসরি দোষারোপ করা যেত।  তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার আপীলও করা যেত। 

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হতে ওষুধ বিক্রেতা বা গ্রাম্য ডাক্তারদেরকে বিনা প্রেসক্রিপশনে এন্টিবায়োটিক না বিক্রির নিষেধাজ্ঞাও দিতে দেখা গিয়েছে।  নৈতিকভাবে সেটা অবশ্যই উচিত পদক্ষেপ।  কিন্তু যদি উপজেলায় রেজিস্টার্ড চিকিৎসক না থাকে তাহলে রোগীরা প্রেসক্রিপশন পাবে কোথায়? রোগীরা কিভাবে এবং কোথায় নেবে চিকিৎসা সেবা?

নিজেদের নাকের ডগায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কি সামান্য রোগের কারণে হাজার টাকা ও সময় ব্যয় করে চিকিৎসার জন্য তাদের হবে যেতে শহরে?

এক্ষেত্রে আমাদের দরকার কি করা? ডিসপেন্সারদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বা এন্টিবায়োটিক বিক্রির অনুমতি দেয়া? নাকি স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়মিত মেডিক্যাল অফিসারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা? কোনটা সংগত?

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের দেখা যায় প্রায় প্রত্যেকেরই শহরে ব্যক্তিগত ডাক্তারী চেম্বার থাকে।  ফলে সেখানে সময় দিতে হয় তাদের কর্মস্থলের সরকারি দায়িত্ব ফেলে।  এরই ফাঁকে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো থাকে ডাক্তারবিহীন।  কিন্তু তারা কি পারেন না উপজেলায় চেম্বার করতে যদি প্রকৃতই রোগীকে সেবা দেওয়ার মানসিকতা তাদের থাকে! কেবল শহরমূখী কেন? তার কারণটাই বা কি?

কারণ একটাই।  তা হলো অর্থ বা ব্যবসার প্রতি ঝোঁক।  প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তারী করে তো তেমন পয়সা আয় করা যায় না।  সেখানকার মানুষগুলো গরীব।  জনসংখ্যায়ও কম।  ফলে রোগীর সংখ্যা মন্দ।  সুতরাং সেখানে টাকা আয়ের সুযোগ খুবই সীমিত।  অথচ তারা জানেন যে, ডাক্তারী কেবল আয়ের একটি পেশা নয় এটি একটি সেবামূলক পেশা বটে।  কিন্তু নীতিগত অর্থে আমরা ক’জনে এখন নিয়ম মেনে চলি!

চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস চিকিৎসকদের দীর্ঘ শপথনামা দিয়েছিলেন রোগীদের কল্যাণে।  যেখানে নিজের স্বার্থকে না দেখে রোগীদের সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রæতি রয়েছে।  যা ডাক্তারী শিক্ষায় এ শপথনামা পড়ানো হয়।  কিন্তু আজকাল আমরা ক’জনে গুরুর নির্দেশ পালন করি বা মেনে চলি! নিজের পায়ে নিজে একটু দাঁড়াতে পারলে গুরুকেও তুচ্ছ মনে করি অধিকাংশ মানুষ। 

যা হোক, কথা হলো শুধু বিজ্ঞাপন বা প্রদর্শনীর আয়োজন করলে চলবে না।  কার্যতই বাস্তবে কাজের প্রতিফলন আনা চাই।  এন্টিবায়োটিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যে ফরমালিনসহ অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যোগীকরণের বিষয়েও প্রশাসনিক আমল ও সুদৃষ্টি আনতে হবে।  চিকিৎসা জগতে আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। 

চিকিৎসা ক্ষেত্রসমূহের কর্মস্থলে নিয়মিত ডাক্তারের উপস্থিতির লক্ষে প্রশাসনিক তৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে।  তবেই আমরা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিপ্লবে কাংখিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হব।  বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব একটি সুস্থ-সুন্দর জাতি হিসেবে।  ফলশ্রুতিতে প্রকৃতই দিতে পারব একটি সোনার বাংলার রূপ।  সুতরাং তার জন্য চাই যার যার অবস্থানে সত্যিকারের দায়িত্ববোধ, অধ্যাবসায় এবং সর্বোপরি নিজের কাজ বা দায়িত্বের প্রতি ভালাবাসা। 


লেখক : পুষ্প মোহন চাকমা

Abu-Dhabi


21-February

keya