১:০৮ এএম, ১৬ জুলাই ২০১৮, সোমবার | | ৩ জ্বিলকদ ১৪৩৯


মায়ের কোলে চড়েই বাবার খুনির বিচার চাইলো তিন বছরের ছদক

০৯ জানুয়ারী ২০১৮, ০৮:৫৪ পিএম | সাদি


জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি প্রতিনিধি : তিন বছরের ছদক চাকমা মায়ের কোলে চড়েই এসেছে বাবার খুনির বিচার চাইতে।  পাশে বড় বোন ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থি আর্য্যশিলা চাকমা (১১)।  সঙ্গী চাচা-জেঠা, স্বজনসহ আরো অনেক প্রতিবেশি।  ২৫ দিন ধরে না দেখা বাবার খুনিদের গ্রেফতারে দাবীতে মুখের ভাষার জায়গায় ব্যানারটিই যেনো মূর্ত হয়ে উঠেছে। 

রাঙামাটিতে প্রতিপক্ষের হাতে সম্প্রতি খুন হওয়া ইউপিডিএফের দুই নেতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের খন্ডিত চিত্র এটি।  মঙ্গলবার (০৯ জানুয়ারি) সকালে জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহতদের পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।  এসময় স্বজনদের হারিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব ও প্রশাসনের অসহযোগিতার নানা বিষয়ও তুলে ধরেছেন নিহতদের স্বজনেরা। 

সকাল সাড়ে এগারোটা।  সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করছিলেন গত ৫ ডিসেম্বর নানিয়ার চরে খুন হওয়া অনাদী রঞ্জন চাকমার ছেলে রিন্টু চাকমা(২৮)।  এসময় স্বামীর প্রসঙ্গ আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন খুন হওয়া আরেক নেতা প্লুটো চাকমার স্ত্রী আলপনা চাকমা (৩০)।  মুহুর্তেই থেমে যায় বক্তব্যপাঠ; নেমে আসে পিন পতন নীরবতা।  মায়ের কান্না দেখে চিৎকার করে শামিল হয় কোলে থাকা ছেলে ছদকও।  মেয়ে আর্য্যশিলাও ফুঁপাতে শুরু করে।  ভারী হয়ে আসে পরিবেশ।  শান্তনার ভাষা খুঁজে পান না কেউই।  আর্য্যশিলা কীসে পড়ে? আলপনার কাছে এক সংবাদকর্মীর এমন প্রশ্নে কিছুটা নীরবতা ভাঙে।  রিন্টু চাকমা আবারো বক্তব্য পাঠে মনযোগ দেন। 

এসময় অনাদী চাকমার স্ত্রী রমনাদেবী চাকমা(৫০), বড় সহোদর রাজ্য চাকমা(৬০), দুই মেয়ে রিনা চাকমা(৩২) ও রেনুকা চাকমা(২৩) ও প্লুটো চাকমার বড় সহোদর বদিন কুমার চাকমা(৫৫) সহ স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। 

প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন প্লুটোর স্ত্রী আলপনা চাকমা।  তার বাড়ি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের ডেবাছড়ি পাহাড়ি গ্রামে।  আকস্মিকভাবে স্বামীর খুন হওয়ায় তাকে ভর করেছে রাজ্যের হতাশা; হারিয়েছেন দিশাও।  বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি আমার স্বামী।  সন্ত্রাসীরা কেবল আমার স্বামীকে খুন করেনি; তারা আমাদের জীবনও শেষ করে দিয়েছে।  দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।  তাদের লেখাপড়া কীভাবে হবে? চোখে এখন ভীষণ অন্ধকার দেখছি।  কীভাবে সংসারের খরচ চালাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। 

অনাদী রঞ্জন চাকমার ছেলে রিন্টু চাকমা অভিযোগ করে বলেন, গত ৮ ডিসেম্বর নানিয়ারচর থানায় মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশ এখনো তা নথিভুক্ত করেনি।  এমনকি হত্যাকারীরা নানিয়ারচরে উপজেলা সদরসহ প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছেনা।  গ্রেফতারের কোন চেষ্টা আছে বলেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।  ‘নব্য মুখোশ বাহিনী’র প্রধান তপন বিকাশ চাকমা ওরফে বর্মার বিরুদ্ধে নানিয়ারচর থানায় খুন ও অপহরণসহ ৫টি ফৌজদারী মামলা রয়েছে।  এরমধ্যে ২০০৬ সালে নানিয়ারচরের ঘিলাছড়ি সেনা ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল আলম গাজী হত্যা মামলা আলোচিত। 

অনাদী চাকমার সহোদর রাজ্য চাকমা(৬০) বলেন, রাজনীতির ভাষা বুলেট হতে পারেনা।  আমরা অত্যন্ত সাধারণ ও নিরীহ মানুষ।  শান্তিতে থাকতে চাই।  হত্যা বন্ধে সরকারের নজর দেওয়া দরকার।  নইলে প্রতিহিংসার আগুনে আরো মায়ের বুক খালি হতে থাকবে। 
গত ৫ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি সদস্য অনাদী রঞ্জন চাকমাকে নানিয়ারচরের তৈচাকমা দজর পাড়া এলাকায় (১৮ মাইল) গুলি করে হত্যা করে দুর্বত্তরা।  এর ১০ দিন পর গত ১৫ ডিসেম্বর জেলার বন্দুকভাঙা ধামাইছড়া মোনপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ সংগঠক অনল বিকাশ চাকমা প্লুটোকে গুলি করে খুন করে প্রতিপক্ষের অস্ত্রধারীরা।  এই দুটি হত্যাকান্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক পার্টির প্রধান কথিত বর্মা ও তরুর নেতৃত্বাধীন ‘নব্য মুখোশ বাহিনী’কে দায়ি করেছেন নিহতদের স্বজনেরা। 

অবিলম্বে অনাদী রঞ্জন চাকমা, অনল বিকাশ চাকমা প্লুটো ও সর্বশেষ গত ৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে খুন হওয়া ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমার খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করা হয় এসময়।  এছাড়া বর্মা-তরুর নেতৃত্বাধীন ‘নব্য মুখোশ বাহিনী’ নামক সন্ত্রাসি সংগঠন ভেঙে দিয়ে তাদের সন্ত্রাসি কর্মকান্ড বন্ধ করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবী জানানো হয়।