১১:০৫ এএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৭ সফর ১৪৪০


গাছ না কেটে সড়ক তৈরির পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের দাবী

১৪ জানুয়ারী ২০১৮, ১১:০৯ এএম | জাহিদ


হাবিবুর রহমান, যশোর প্রতিনিধি : যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের (যশোর রোড) প্রসিদ্ধ যশোর রোড চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হচ্ছে। 

এজন্য সড়কটির দুই পাশে থাকা নতুন-পুরনো সব গাছ কেটে ফেলা হবে।  ৩৮কিলোমিটার সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ননে ২ হাজার ৩৩২ ছোট বড় গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  তবে জেলা পরিষদ ও সড়ক জনপথ বিভাগের মালিকানা দ্বন্দ্বে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।  আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গাছের প্রকৃত মালিক নিধারিত হবে।  ৩২৮ কোটি টাকার প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। 

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেই কাজ শুরু করতে আগ্রহী সড়ক ও জনপথ বিভাগ।  যদি ঐতিহ্যবাহী যশোর রোডের গাছগুলো কাটা নিয়ে আপত্তি আছে যশোরের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের।  তারপরও উন্নয়নের স্বার্থে জনপ্রতিনিধি ও আমলরা গাছ কাটতে একমত হয়েছেন। 

জানা যায়, বর্তমানে যশোর- বেনাপোল মহাসড়ক একসময় ‘যশোর রোড’ হিসেবে পরিচিত ছিল।  ১৮৪০ সালে জমিদার কালী পোদ্দারের মা ছায়ায় ছায়ায় গঙ্গা স্নানে যাবেন, এজন্য রাস্তার দুই ধারে তিনি বিদেশ থেকে অতি বর্ধনশীল রেইন্ট্রি বৃক্ষের চারা এনে রোপণ করেন।  সেই বৃক্ষগুলোই যশোর বেনাপোল সড়কে এখনো ছায়া দিচ্ছে। 

দেশ ভাগের পর ৮০ কিলোমিটার যশোর রোডের ৩৮ কিলোমিটার পড়ে বাংলাদেশ অংশে।  বাকী ৪২ কিলোমিটার পড়ে ভারতের অংশে পড়ে।  মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু শরনার্থ এই মহাসড়ক পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।  মুক্তিযুদ্ধের সময় বিখ্যাত কবি অ্যালেন গ্রিন্সবার্গ ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা লেখেন।  ঐতিহ্যের দিক থেকে মহাসড়কের গাছগুলো ইতিহাসের স্বাক্ষী।  গাছগুলো কেটে মহাসড়ক সম্প্রসারণ নিয়ে যশোরবাসীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ছিল।  একজন সংসদ সদস্য সংসদে ভাষণ দিয়ে গাছগুলো রেখে সড়ক সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন। 

সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে যশোর-বেনাপোল সড়ক যথাযথমানে নির্মাণ ও প্রশস্তকরণের সুবিধার্থে রাস্তার দুই পাশের গাছসমূহ অপসারণ বিষয়ে মত বিনিময় সভায় তিনজন সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জনপ্রতিনিধি ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সর্বসম্মতিক্রমে ২হাজর ৩৩২টি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২১ মার্চ একনেকের সভায় ৩২৮কোটি টাকা ৯০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে যশোর-বেনাপোল জাতীয় সড়কের (দড়াটানা-বেনাপোল পর্যন্ত) ৩৮দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক যথাযথমানে প্রশস্তকরণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। 

প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী ‘মহাসড়কের প্রস্থ ৭দশমিক ৩মিটার থেকে বৃদ্ধি করে ১০দশমিক ৩ মিটার করা হবে।  একই সঙ্গে সড়কের উভয় পাশে ১মিটার করে মাটির জায়গা রাখা হবে।  এতে সড়কের প্রস্থ দাঁড়াবে ১২দশমিক ৩মিটার।  এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে মহাসড়কের উভয় পাশের মোট ২ হাজার ৩১২টি গাছ কাটতে হবে বলে সভায় জানানো হয়। 

যশোর জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল দাবি করেন, যশোর-খুলনা, যশোর- বেনাপোল ও যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের জমি যশোর জেলা পরিষদের মালিকানাধীন।  ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমলে সড়কের যাবতীয় উন্নয়ন কাজ, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষনের দায়িত্ব জেলা পরিষদ পালন করে আসছে। 

জেলা পরিষদ কখনো ওই মহাসড়কের জমি কিংবা গাছ হস্তান্তর করেনি।  ফলে সওজের মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই।  রাস্তার পাশের গাছ কেটে মহাসড়ক সম্প্রাসরণ করতে হবে এটা সময়ের দাবি।  এ দাবিতে জেলা পরিষদও একমত।  গাছ অপসারণ তথা গাছ কাটতে সওজ চিঠি দিলেই আমরা কাজ শুরু করে দেব। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্র জানায়, পরিবেশের ভারসাম্যের বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ মহাসড়কের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী প্রাচীন গাছ না কাটার সিদ্ধান্ত নেয়।  কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।  ৬ জানুয়ারি গাছ কাটার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 
তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যশোর- বেনাপোল মহাসড়কের গাছগুলো সড়ক ও জনপথ বিভাগের।  কিন্তু জিলা পরিষদও মালিকানা দাবি করছে।  এ ব্যাপারে অচিরেই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় গাছের মালিকানা নির্ধারণ হবে।  গাছের মালিকানা যাদের হবে, তারা গাছ কেটে নিবেন। 

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে।  শিগগির কাজ শুরু করতে পারবো বলে আশাবাদী। 

এদিকে গাছগুলো সংরক্ষণ করে রাস্তা প্রশস্ত করণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।  সোমবার পার্টির যশোর জেলা কমিটির এক সভায় এ দাবি জানান। 

পার্টির জেলা সভাপতি ইকবাল কবীর জাহিদ উদ্বেগ প্রকাশ করে ও ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, যশোর-বেনাপোল সড়ককে চার লেন করা করা হবে, এর থেকে আনন্দের সংবাদ হয় না।  কিন্তু যখন ২৩০০ গাছকে হত্যা করা হবে শুনি তখন আনন্দের সংবাদ বুদ বুদ হয়ে বাতাসে মিলেয়ে যায়। 

গাছ কাটার পক্ষে কত কু যুক্তি কতজনে দিচ্ছেন।  আমরা যারা গাছ হত্যার বিপক্ষে তাদের উন্নায়ন বিরোধী ঐতিহ্য প্রেমি প্রাচীন পন্থী বলা হচ্ছে।  এ সিদ্ধান্ত কাদের সার্থে তা অবিলম্বে বদলাতে হবে।