৬:১০ এএম, ২৫ জুন ২০১৮, সোমবার | | ১১ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

যেভাবে বিল্লাল মিয়া হলেন মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিক

২২ জানুয়ারী ২০১৮, ০১:০৯ পিএম | রাহুল


আশ্রাফুল মামুন, কুয়ালালামপুর প্রতিনিধি : বাঙ্গালী আট- দশজন যুবকের মত ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে শ্রমিক ভিসায় বিল্লাল মিয়া পাড়ি জমান  স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় ২০০৭ সালে। 

কিন্তু সেখানে তার জন্যে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে তিনি হয়তো আগে কোন দিন ভূলেও কল্পনা করেন নি আগে জানলে হয়তো তার গল্পটা অন্যরকম হতো।  সকল প্রতিকুলতা কাটিয়ে বিল্লাল মিয়ার জিরো থেকে হিরো হওয়ার পেছনের গল্পটি হতে পারে প্রবাসীদের জন্য প্রেরনার দৃষ্টান্ত, তিনি এখন মালয়েশিয়ায় সফল ব্যবসায়ী। 

মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টে ৭ দিন অনাহারে অর্ধাহারে পড়ে থাকার পর কয়েক দফা দালালের হাতবদল হয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গহীন অরন্যে পামওয়েল বাগান পরিষ্কারের জন্যে, সেখানে মশার কামড়ে প্রথম দিনেই অসুস্থ হয়ে যান বেতন না পাওয়া মালিক ও স্থানীয় তামিল সন্ত্রাসী দ্বারা অত্যাচারিত অবশেষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, সেই থেকে যুবক ব্যবসায়ী এখন মালয়েশিয়াস্থ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক।  নিয়োগ দিয়েছেন বাংলাদেশী শ্রমিক। 

এতক্ষন বলছিলাম প্রতিকুলতা জয় করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উদ্যেমী যুবক মোঃ বিল্লাল মিয়ার কথা,  তিনি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আখাউড়া থানার কল্যানপুরের বাসিন্দা, বর্তমানে কুয়ালালামপুর রাজধানীর বানিজ্যিক এলাকা বুকিত বিনতান এ রয়েছে তার বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গুলো, এ শহর বিদেশী পর্যটকদের পদভারে মূখরিত থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা। 

এখানে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের কাছে শুনে সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করা হয় বিল্লাল মিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো,  এগুলোর মধ্যে রয়েছে জুতার দোকান,  ইলেকট্রনিক্স পন্যের দোকান ও ক্ষুদ্র ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।  এগুলোতে কাজ করছে বাংলাদেশী শ্রমিক তবে শ্রমিকদের মধ্যে তার আত্বীয়স্বজনই বেশি। 

জানতে চাইলে বিল্লাল মিয়া যা বললেন তা এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো, আমি ছোটবেলা থেকেই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখী হয়ে আসছি লক্ষ্যটা স্থির রেখে একটার পর একটা বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গিয়েছি কখনো  ভয় পেয়ে বা বিরক্তি থেমে যাইনি, আমি ২০০৭ সালে প্লানটেশন শ্রমিক ভিসায় মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করি একটি বাংলাদেশী গ্রুপের সাথে, বিমান বন্দরে  আাসার পর মালিক ও দালাল কারো কোন হদিস পাচ্ছিলাম না,  সাথে যা ছিল তা দিয়ে দুই তিন ঠিকমত খেয়েছি তারপর এখান থেকেই শুরু হয় কঠিন পরিস্থিতির সাথে লড়াই অবশেষে সাতদিন পর তিনদফা বিক্রি হয়ে জনমানবহীন গহীন জঙ্গলে একটি পামওয়েল গাছের বাগানে আমাদের কাজ দেওয়া হয়, প্রথম দিনেই জংলী মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হই তারপর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ১১ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরে যাই,  এভাবে কাজ করার সময় স্থানীয় কুখ্যাত ইন্ডিয়ান তামিল সন্ত্রাসীরা প্রতিদিন রাতে আমাদের রুমে ঢুকে মারধর করে টাকা দেওয়ার জন্য তখন আমরা বলি আমরা নতুন এসেছি মালিক এখনো আমাদের বেতন দেয়নি তখন তারা বলে বেতন পাওয়ার পর তাদের টাকা দিতে হবে নইলে এখানে থাকা যাবে না,

মাস শেষে মালিকের কাছে যাই বেতনের জন্য মালিক বলে তোমাদের বেতন ৮০ রিংগিত সারা মাসের খাবার বিল হয়েছে ৯৬ রিংগিত সুতরাং আরো ১৬ রিংগিত আমাকে দিতে হবে,  তখন আমার মাথায় যেন আকাশ ভেংগে পড়লো এখন কি করবো এতটাকা দিয়ে বিদেশে এসে লাভ কি হলো?  তারপর আমি মালিকের কাছে বললাম কাজ করবো না পার্সপোট ফেরত দিন মালিক পার্সপোট দিতে অস্বীকার করে, আমি তখন আর দেড়ি না করে পালিয়ে যাই তখন দিনের বেলায় কাজের খোঁজে কুয়ালালামপুরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ি আর রাতের বেলায় ঘুমাতে হয় পার্কে কিংবা খোলা জায়গায়, মালয় ভাষায় বুঝি না পড়াশুনা নাই বিধায় ইংরেজি ও বলতে পারতাম না আর এখনতো মালয়, ইংরেজী, আরবি, হিন্দি সব বাসায় কথা বলতেও পারি বুঝতেও পারি, তখন চোখে মূখে অন্ধকার দেখেছিলাম কার কাছে যাব কোথায় যাব, এদিকে আত্নীয় স্বজন বলছে দেশে চলে আসেন বাঁচলে টাকা রোজগার করা যাবে কিন্তু আমি ভাবছি ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা আত্নীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার ও সূধের উপর এনেছি তার কি হবে,  তারপর আরও টাকা দেশ থেকে আনতে হয়েছে অনেক দিন বেকার থাকার পর এক বাংলাদেশী প্রবাসী কে ২০০ রিংগিত ঘোষ দিয়ে কে এল সেন্টারে রেস্টুরেন্টে কাজ পাই তারপর আরও একাধিক স্থান পরিবর্তন করে এভাবে পাঁচ বছর কাজ করে সূধের টাকা ও দেনার টাকা পরিশোধ করে কিছু টাকা জমাতে সমর্থ হই, তারপর অল্প পুঁজিতে ছোট পরিসরে একটি দোকান দেই সেখানেও নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় আমার নীতি আদর্শ ও লক্ষ্য স্থির রেখে  সব সমস্যা সমাধান করে ধীরে ধীরে আমি সফলতার মূখ দেখি এজন্য আমাকে অনেক ধৈর্য্যের সহিত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে । 

তবে অন্য প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ থাকবে,  ব্যবসা ও চাকুরীতে মালয়েশিয়ায় ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু চাকুরী করে সব খরচ বাদ দিয়ে বাড়িতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বেশি পাঠানো অনেক সময় কষ্ট হয়ে যায়, যে কেউ চাইলে স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব আর তার আগে অবশ্যই ব্যবসায়িক জ্ঞান থাকা জরুরী যেমন,  আত্মবিশ্বাসী,পরিশ্রমী, লেগে থাকার মনমানসিকতা, দক্ষতা এবং এখানকার ভাষা সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনার ভাল অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।