৫:০৮ পিএম, ১৮ জুন ২০১৮, সোমবার | | ৪ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

৮ বছর পর মৃত ব্যক্তিকে সশরীরে দেখে চমকে উঠে আদালত

২৯ জানুয়ারী ২০১৮, ০৮:৩৯ পিএম | নিশি


এস কে রাসেল, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: অপহরণের পর খুন করে লাশ গুমের দীর্ঘ নয় বছর আগের মামলাটির বিচার কার্যক্রম যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে - তখন সকলকে অবাক করে দিয়ে আদালতে বিচারকের সামনে সশরীরে উপস্থিত হলেন জালাল উদ্দিন নামের সেই মৃত ব্যক্তি।  সোমবার ১৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রাজজ আদালতে এ ঘটনা ঘটে।  মাদক খাইয়ে ও ইনজেকশন দিয়ে দীর্ঘ ৮ বছর ভিকটিমকে অপ্রকৃতিস্থ করে রাখা হয়েছে আইনজীবীর মাধ্যমে এমন বক্তব্য শুনে নড়েচড়ে বসেন বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহমান। 

নির্দেশ দেন মামলাটি নিম্ম আদালতে পাঠানোর।  প্রদত্ত আদেশে বিচারক সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মো. জালাল উদ্দিনের জবানবন্দি গ্রহণসহ নতুন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করার ব্যবস্থা নিতে মুখ্য বিচারিক হাকিমকে আদেশ দেন।  একই সঙ্গে হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়।  এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় সকল মহলে। 

ভয়ানক অপরাধের এ মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে রিমান্ড ও হাজত খেটে জামিনে থাকা আজহারুল ইসলাম, মো. হীরা মিয়া ও রুহুল আমিন রঙ্গুর ১৫ জানুয়ারি ছিল আদালতে হাজিরার নির্ধারিত তারিখ।  দীর্ঘ ৮ বছর পর আসামিদের হাজিরার দিনে আইনজীবীর মাধ্যমে জালাল উদ্দিনের একই আদালতে সশরীরে হাজিরের ঘটনায় জীবন ফিরে পায় অভিযুক্ত তিন আসামি।  বদলে যায় মামলার গতি-প্রকৃতি ও ধারা।  আর এ ঘটনা হয়ে ওঠে ‘টক অব দ্য’ কোর্ট, ‘টক অব দ্য’ কিশোরগঞ্জ।  এ নিয়ে এখন চলছে মুখ রোচক নানা গুঞ্জন এবং আলোচনা-সমালোচনা।  বেরিয়ে আসছে এ বহুল আলোচিত মামলার নেপথ্য কাহিনী। 

জানা গেছে, প্রসঙ্গত: কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের লাকুহাটি গ্রামের ললিতা বেগম ২০০৯ সালের ১০ জুলাই তার স্বামী মো. জালাল উদ্দিনকে অপহরণের পর খুন করে লাশ গুমের অভিযোগ এনে ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় (৩৬৪/৩০২/৩৪ ধারা) একটি মামলা রুজু করেন। 

এ মামলায় পার্শ্ববর্তী ভাটি গাংগাটিয়া ও সৈয়দপুর  গ্রামের  শংকর সূত্রধর, মো. আসাদ মল্লিক, রুহুল আমিন রঙ্গু, হিরা মিয়া ও আজহারুল ইসলামকে আসামি করা হয়।  প্রাথমিক পর্যায়ে হোসেনপুর থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করলেও পরবর্তীতে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।  কিন্তু; দীর্ঘ তদন্ত ও অনুসন্ধানকালে অপহৃত জালাল উদ্দিনের লাশ কিংবা অস্থিত্ব না পেয়ে এ অবস্থাতেই আদালাতে চার্জশীট দাখিল করা হয়। 

এ সময় এ মামলার ভয়ে প্রধান আসামি শংকর সূত্রধর বাড়ি-ঘর ও সহায়-সম্পতি ফেলে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর মামলার সাক্ষী ও মদদদাতা হিসাবে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন দিলু ও তার ভাতিজা দিদারুল ইসলাম ফারুক ঘর-বাড়ি ও সহায়-সম্পতি দখল করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।  এছাড়া অন্যান্য আসামিদের মধ্যে আসাদ মল্লিক আজও ফেরারী জীবন কাটাচ্ছেন।  অন্য তিন আসামি আজহারুল ইসলাম, হিরা মিয়া ও রুহুল আমিন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে, রিমান্ড ও  হাজত খেটে জামিনে রয়েছেন। 

এ বহুল আলোচিত মামলা ও ভিকটিম জালাল উদ্দিনের খোঁজ নিতে রোববার দুপুরে লাকুহাটি গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শন এবং অনুসন্ধান কালে মেলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য।  জানা যায় মামলার অনেক নেপথ্য কাহিনী ও রহস্য।  জড়াজীর্ণ ও ভাঙ্গাচোড়া, পাকা-আধাপাকা ও কাাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে উত্তর লাকুহাটি জালাল উদ্দিনের বাড়িতে পৌঁছতে হয়।  সোজাসুজি বাড়ির ভেতরে ঢুকেই পাওয়া যায় জালাল উদ্দিনের স্ত্রী ও মামলার বাদি ললিতা বেগমকে। 

জালাল উদ্দিনের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, সে খুবই অসুস্থ, অন্যদের সহযোগিতায় বাড়ির পেছনের ফসলের মাঠের দিকে গেছেন।  আপনারা দাঁড়ান, আমি তাকে নিয়ে আসছি।  এ সময় তার পিছু নিয়ে ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা গেল দূরে অন্য দু’জন কৃষকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জালাল উদ্দিন কথা বলছিলেন।  ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও স্ত্রী ললিতা বেগম জালাল উদ্দিনের কাছে গিয়ে কিছু একটা বলতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। 

হঠাৎ জালাল উদ্দিন স্ত্রী ললিতা বেগমের কাঁধে মাথা রেখে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।  তাকে খুব সাবধানে ধরে বাড়িতে আনা হলে ঘরে ঢুকেই বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ে স্ত্রীকে মাথায় পানি ঢালতে বলেন।  চোখের সামনে এভাবে গুরুতর অসুস্থ রোগী বনে যাওয়া জালাল উদ্দিন কিছুতেই আর কথা বলছিলেন না।  অনেকক্ষণ অপেক্ষা ও চাপাচাপির পর অনেকটা গুঙানোর সুরে বললেন, ‘ওরা আমারে ধইর‌্যা নিয়া কই নিছিন কইতারতাম না।  গাঞ্জা-মুঞ্জা কিতা খাওয়াইয়া আমারে অজ্ঞান কইর‌্যা রাখছিন। 

কিছু দিন আগে আমার একটু একটু ছেতন অয়।  আমি বুজদাম ফারি-এইড্যা বিক্রমপুর এলাহা।  এরপর ফাগলের মত এদিক সেদিক গুরতে গুরতে আমি বিনা টিহেডে গাড়িত উইট্যা ফিইর‌্যা আইলে লোকজন আমারে কোর্টে লইয়্যা গ্যাছে।  এর বেশি কিছুই কইতারতামনা। ’

তবে এ সময় মূল ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে জালালের স্ত্রী মামলার বাদি ললিতা বেগম জানালেন, ‘তার স্বামী ভাঙ্গারির ব্যবসা করতেন।  সংসারের অভাব-অনটন ঘুছাতে বিদেশ যেতে পাশের গ্রামের আদম ব্যবসায়ী শংকর সূত্রধর ও আসাদ মল্লিককে ধার-দেনা ও সুদ করে তিন লাখ টাকা দেয়।  তারা কয়েক বার তারে (স্বামী জালাল উদ্দিনকে) ঢাহা নিয়া ফিরত আনে।  এক পর্যায়ে বিদেশ পাঠানোর কথা কইয়্যা তারে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়, কিন্তু; এর পর বেশ কিছু দিন ফরও তার খোঁজ ফাইতেছিলাম না।  শেষ পর্যন্ত এই দুই আদম ব্যাফারি ও তিন দালালরে আসামি কইর‌্যা থানায় মামলা দেই। 

হেইন যহন নিখোঁজ হইছিলেন, তহন আমার বাচ্চা-কাচ্চা কোলে ছিল, এহন বড় মেয়ে নাইনে ফড়ে।  আর এর মধ্যে আমার স্বামীর মা মরল, বাফ মরল হেইন দেখতারছেনা।  এ সময় মূল আদম বেপারি শংকর সূত্রধর কোথায়-সে কি ওই টাকা দিতে কখনো কথা বলেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে মিললো ভিন্ন তথ্য ও রহস্য।  ললিতা বেগম জানালেন, মামলার পর শংকর সূত্রধর বাড়ি-ঘর সহায়-সম্পত্তি ফেলে ফলাইয়্যা গেছেন।  তার বাড়ি-ঘর সহায়-সম্পত্তি অহন আমার মামলার সাক্ষী দিলু ও তার ভাতিজা ফারুকের দহলে। ’ এ সব কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে ললিতা অভিযোগের সুরে বললেন, টেহা ফাই আমরা, আর শংকর বাবুর সহায়-সম্পত্তি বুগ করে সাক্ষীরা, এ কেমন কথা। ’

ললিতাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী সৈয়দপুর গ্রামে এ মামলার অন্য তিন অভিযুক্তের বাড়ি গেলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।  এ সময় আজহার, হীরা ও রঙ্গু নামে তিন আসামি এক সঙ্গে বুক চাপড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমরা হাজত খাটছি, রিমান্ড খাইছি, ফলাইয়্যা বেড়াইছি, আমার সংসার তছনছ অইয়্যা গ্যাছে।   আমরার বাচ্চা-কাচ্চাদের লেহা-পড়ার সুযোগ নষ্ট অইছে ওই মিছা মামলায়।  অহন, মরা জালাল ৯ বছর পর ফিইর‌্যা আইছে।  হে হারাদিন সুস্থ চলাফেরা করে, আবার সাংবাদিক দেহলে গুরুতর অসুস্থ অইয়্যা ফরার ভান করে। 

কিন্তু; আমরা যা আরাইছি, তা ফিরত দিব কে?’ তাদের এ ধরণের রোদন-আহাজারি চলার সময় এগিয়ে এলেন নজরুল ইসলাম নামে গ্রামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।   তিনি আলোচনায় অংশ নিয়ে বললেন,  ‘এ মামলার পর গ্রামের সচেতন নাগরিক হিসাবে বুঝতে পারছি, ললিতা বেগম তৃতীয় পক্ষের চালের ঘুটি হিসাবে ব্যবহার হয়েছেন।  শংকর বাবুর সঙ্গে বিদেশ পাঠানোর টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ওই তৃতীয় পক্ষ মামলার সাক্ষী হয়ে নিজেরা সুবিধা লুটে নেয়, শংকর বাবু মামলার ভয়ে দেশান্তরী হওয়ার পর এখন তার বাড়ি-ঘর ও সহায়-সম্পত্তি দুই সাক্ষী দেলোয়ার হোসেন দিলু ও তার ভাতিজা দিদারুল ইসলাম ফারুকের দখলে।  এ ঘটনাই মামলার রহস্য ও নেপথ্য কারিগররা বেরিয়ে আসছে।  শুধু টাকার জন্য এ ঘটনা হলে শংকর বাবুর টাকা দেয়ার সামর্থ্য ছিল।  বিদেশে যাওয়ার জন্য দেয়া অর্থ উদ্বারের আশায় তৃতীয় পক্ষের পাতা ফাঁদে পা দিয়েই হয়তো আর বেরিয়ে আসতে পারেননি দরিদ্র জালাল ও ললিতা বেগম। ’ 

কথা হলে আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. মিজানুর রহমান বলেন, অন্যয়ভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে তৃতীয় পক্ষের মদদে এ মামলা রুজু করা হয়।  এ ঘটনায় আসামিদের অপূরণীয় আর্থিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে।  যা কোন দিন পূরণ হওয়ার নয়। 

হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন জানান, হ্যাঁ, আমি এ ঘটনা শুনেছি।  এ থানার নয় বছর আগের অপহরণ মামলার ভিকটিম সশরীরে আদালতে হাজির হয়েছেন।  এ ব্যাপারে কোর্টের নির্দেশনা আসলে আমি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিব।  কিশোরগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর (সরকারি আইন কর্মকর্তা) অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বললেন, এ ধরণের ঘটান ব্যতিক্রম ও অস্বাভাবিক।   বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও রহস্য উদঘাটনের দাবি রাখে।