১০:০২ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, রোববার | | ৭ রবিউস সানি ১৪৪০




৩৫ পর ম্যানচেষ্টার বিমান বন্দরে পিতা -পুত্রের মিলন!

২৭ জানুয়ারী ২০১৮, ০১:২৩ এএম | সাদি


সিলেট প্রতিনিধি : একটি দু’টি বছর কিংবা এক যুগও নয় দ্বীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর পিতা-পুত্রের মিলন হল যুক্তরাজ্যের ম্যানচেষ্টার বিমানবন্দরে।  বৃটিশ বংশোদ্ভুদ স্ত্রী অ্যানজুলির সাথে বিচ্ছেদের সাথে সাথে তিন মাস বয়সী একমাত্র ছেলে জেইমি নিকট থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুদ সুনামগঞ্জর ছাতকের ছওয়াব আলী। ’ টানা ছ’বছর কারাভোগের পর ছওয়াব আলীর কারাবাস শেষ হলেও সন্ধানে নেমে এক সময় হারিয়ে ফেলেন সন্তান এবং স্ত্রীর খোঁজ। ’ কিন্তু রক্তের টানে শেষ পর্য্যন্ত ৩৫ বছর পর সেই তিন মাস বয়সী ছেলে জেমির চেষ্টায় অবশেষে ম্যানচেষ্টার বিমানবন্দরে মঙ্গলবার তাদের পিতা-পুত্রের মহা মিলন ঘটলো। ’

পাবিরারীক সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশী বংশোদ্ভুদ সুনামগঞ্জের ছাতকের ছওয়াব আলী ৩৬ বছর আগে ব্রিটিশ বংশোদ্ভুদ তরণী অ্যানজুলিকে বিয়ে করেছিলেন।   বিয়ের বছর দুয়েক পর তাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও এরই মধ্যে এই দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেয় সন্তান জেইমি।  কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনার শিকার ছওয়াব আলীকে জেল খাটতে হয় ছয় বছর।  কারাভোগের পর অনেক সন্ধান করেও স্ত্রী-সন্তাননের কোন খোঁজই পাননি। ’

ছওয়াব আলীর চাচাত ভাই মো. আবদুর রউফ জানান, লন্ডনে ব্রিটিশ তরুণী অ্যানজুলিকে ৩৬ বছর আগে বিয়ে করেন ছওয়াব আলী। ’ এক বছর পর জুলির কোলজুড়ে আসে জেইমি।  বছরখানেক পর অবশ্য অ্যানজুলির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে ছওয়াব আলীর।  পরে কারাবাস করতে হয় তাকে। ’ স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে তার আর কোনও যোগাযোগ ছিল না। ’

এদিকে, বিচ্ছেদের পর ছেলেকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে স্থায়ী হন অ্যানজুলি।  জেইমিও বেড়ে উঠতে থাকে বাবার সহচর্য ছাড়াই।  মায়ের কাছে বাবার সন্ধানও পায়নি কিশোর জেইমি।  পরে উচ্চ শিক্ষা নিতে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায়  জেইমি। ’ পড়ালেখা শেষ করে সেখানেই কর্মরত হন জেইমি । 

ছোটবেলা থেকেই বাবার স্নেহ বঞ্চিত হলেও বাবার সাথে রক্তের টানে বাবার সন্ধান চালিয়ে যেতে থাকেন জেইমি।  জেইমি এক সময় জানতে পারেন, তার বাবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, শেষ পর্যন্তসে বছরখানেক আগে বাংলাদেশে সুনামগঞ্জের ছাতকে চলে আসে বাবার খোঁজে। 

এদিকে বাবার সন্ধান করতে এক সময় সুনামগঞ্জের ছাতকে খোঁজ পান বাবার স্বজনদের।  অ্যানজুলি ও ছওয়াব আলীর আত্মীয় আবদুর রউফ জানান, সুনামগঞ্জের ছাতকে গিয়ে বাবা ছওয়াব আলীর আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে পান জেইমি।  তার মধ্যে আশার সঞ্চার হয়, হয়তো বাবাকে খুঁজে পাবেন।  স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বাবার বিভিন্ন তথ্য।  জানতে পারেন, তার বাবা এখন বসবাস করছেন যুক্তরাজ্যের রচডেলে। ’

ছওয়াব আলীর ভাতিজা কাপ্তান মিয়া জানান, অবশেষে পিতা-পুত্রের মধ্যে যোগাযোগ হয় গত সপ্তাহে।  তারই সূত্র ধরে মা অ্যানজুলি আর ভাই জ্যাসনকে নিয়ে জেইমি ম্যানচেস্টারে যাবেন বলে জানান। ’ দিনক্ষণ ঠিক হয় চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারী মঙ্গলবার। 

অবেশেষ স্বজনদের সূত্র ধরে ৩৫ বছর পর গল্পের মতো  ২৩ জানুয়ারী মঙ্গলবার মা অ্যানজুলিকে নিয়ে ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরে হাজির হন জেইমি।  আগে থেকেই খবর পাওয়া ছওয়াব আলীও রচডেলে থেকে স্বজনদেও নিয়ে হাজির হয়েছিলেন  ম্যানচেষ্টার বিমান বন্দরে ছেলেকে বুকে টেনে নিতে।   সেখানেই ৩৫ বছর পর মহা মিলন ঘটলো পিতা-পুত্রের।  পিতা-পুত্রের মহামিলনের সাক্ষী হলো যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর। 

কাপ্তান মিয়া বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাবা-ছেলের মিলনের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন।  পিতাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে জেইমি তাকে জড়িয়ে ধরে।  অনেকক্ষণ ধরে তারা কেউ ই কথাই বলতে পারছিলেন না।  দু’জনের চোখের জলেই যেন সব কথা হয়ে যাচ্ছিল।  পাশে দাঁড়ানো জেইমির মা ও ভাইয়ের চোখেও তখন ছিল অশ্রু। 

আবেগ সম্বরণ করে জেইমি গণমাধ্যমকর্মীদের বিমানবন্দরে বলেন, ‘বাবা আর পরিবারের আপনজনদের কাছে পেয়ে আমি আপ্লুত।  আর কখনও আমি আমার বাবাকে হারাতে চাই না। ’

অ্যানজুলির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আর সংসারমুখী হননি ছওয়াব আলী।  ছেলেকে কাছে পেয়ে একাকী-নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ছওয়াব আলীর মুখেও ভাষা নেই।  তিনিও গণমাধ্যমকর্মীদের বললেন, ‘অ্যানের সঙ্গে আমার যখন বিচ্ছেদ হয়, জেইমির বয়স তখন মাত্র তিন মাস।  এরপর ছয় বছর জেল আমার জীবনকে এলোমেলো করে দেয়।  আজ ৩৫ বছর পর সন্তানকে কাছে পেয়ে আমি বাকরুদ্ধ, হতবিহব্বল অতীতের সব অপুর্ণতা আজ ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পেরে পুর্ণ হল। 



keya