২:০৬ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৫ সফর ১৪৪০


দারিদ্রে ঝরছে মেধা

সর্বোচ্চ সাফল্য পেলেও উচ্চ শিক্ষায় অনিশ্চিয়তা!

১৬ মে ২০১৮, ১২:৪৪ পিএম | জাহিদ


হুমায়ুন কবির সূর্য্য, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : সংসারে বেহাল দশার কারণে সন্তানকে দিতে হয়েছে মিশনারীতে।  মা ক্যান্সারে ধুঁকতে ধুঁকতে প্রাণ নিয়ে চলে গেলেও সন্তানকে কষ্ট চেপে যেতে হয়েছে পরীক্ষা হলে। 

আরেকজন বাবা সন্তানদের মূখে খাবার যোগান দিতে হিমসীম খাচ্ছেন বলে, ছেলের পড়াশুনা বন্ধ হওয়ার পথে? তাহলে দারিদ্রতা কি বাঁধা হবে এই তিনজন মেধাবীর আগামি পথচলায়।  এদের জীবন যেন গল্পকথাকেও হার মানিয়েছে। 

ইতি রানী রায় :
১৭ আগস্ট কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছিলেন ত্রাণ বিতরণ করতে।  প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ইতি রানীর দিনমজুর বাবা মঞ্চের পাশে গাছের ডাল কাটতে গিয়ে পরে যান।  এরপর গুরুতর আহত ধীরেন্দ্রনাথ রায়কে সরকারি সহায়তায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার পর অর্ধাঙ্গ পঙ্গু অবস্থায় আবার ফিরে আসতে হয়েছে রাজারহাটেই।  বিছানায় শয্যাশায়ী বাবা। 

অপরদিকে পেটের খাবার যোগাতে মাকে নামতে হয়ে মাঠে ধান কাটতে বা দিনমজুরী করতে।  এরকম কষ্টকর পরিবারে সন্তানকে বড় করার সামর্থ না থাকায় ইতি রানীকে ভর্তি করা হয় লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জ থানার কাকিনা চার্চ অব গড মিশনে।  আর ছোট ভাই রিপন রায়কে লালমনিরহাট মিশন রোডে অবস্থিত ইন্টার হিলস চার্চে।  বাবা-মাকে ছেড়ে অনেক কষ্টে লেখাপড়া চালিয়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৪ দশমিক ৬৮ পেয়েছে ইতি রানী রায়।  ঠাকুমাসহ ৫ জনের সংসার টানতে হচ্ছে মা শ্রীমতি সুমিত্রা রায়কে।  অপরদিকে বিছানায় শায়িত অসহায় পঙ্গু বাবার চিকিৎসা জোটাতে ব্যর্থ সবাই। 

এমন অসহায় পরিবারের সন্তান ইতি রানী কলেজে ভর্তি হতে এবং বাবার চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানিয়েছে আকূল আবেদন।  ইতি রানীর ইচ্ছে ভবিষ্যতে সেবিকা হয়ে অসহায় দরিদ্র রোগীদের সেবায় নিজেকে ব্রত করা। 

মো: আল আমিন
পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সময় ২০১৭ সালের ২২ জুলাই মরণব্যাধী ক্যান্সারে ভুগতে ভুগতে আল আমিনের মা আমিনা বেগম মৃত্যুকোলে ঢলে পরেন।  বুকে চরম কষ্ট নিয়ে পরীক্ষা দেয় সে।  সবার অলক্ষ্যে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় নাজিম খান উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।  দিনমজুর বাবার সামান্য ৭ শতক জমি।  ৫জনের সংসারে পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারেনা।  তাই বাবাকে দিনমজুরী করেও ছেলের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

এর মধ্যে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে ২০১২ সালে পিএসসি এবং ২০১৫ সালে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় সে।  এসময় বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনার খরচ চালাতে না পেরে হতোদ্যম আল আমিনের পাশে এসে সহযোগিতার হাত বাড়ান স্কুলের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক আইয়ুব আলী।  তার চেষ্টা ও সহায়তায় মায়ের মৃত্যুশোক বুকে ধারণ করে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে সে। 

এইচএসসিতেও ভাল ফলাফল করার আশা রয়েছে আল আমিনের।  কিন্তু দারিদ্রতা তার লেখাপড়ায় প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  তারপরও চোখে স্বপ্ন একজন জেলা প্রশাসক হবার। 

মো: শাহীন আলম :
দিনমজুর বাবার সন্তান মো: শাহীন আলম।  একভাই এক বোনের মধ্যে বড় সে।  বাবা ২০ শতক জমি বর্গা নিয়েছেন।  সেই জমির ধান দিয়ে পেটের ভাত জোটেনা।  সেখানে কিভাবে এইচএসসি পড়াশুনার খরচ যোটাবে এনিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে শাহীন আলম।  কোন কোন সময় তিনবেলা খাবার না জুটলেও ফলাফলে তা ছাপ ফেলেনি।  মেধাবী ছেলেটি ২০১৫ সালের জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছে।  এখন পর্যন্ত স্থানীয় বড় ভাই এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় এই ফলাফল করতে পেরেছে সে।  এজন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। 

এই মেধাবী ছেলেটি চলতি এসএসসি পরীক্ষায় নাজিম খান উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।  ছেলের ফলাফলে বাবা-মা খুশি হলেও তার উচ্চ শিক্ষার খরচ যোগাতে না পেরে ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।  আমরা কি পারিনা এই মেধাবী তিনজনের ভবিষ্যতের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে। 

সমাজের বৃত্তশালী ও দানবীর ব্যক্তিদের কাছে তারা সহয়োগিতার হাত বাড়ানোর জন্য আকূল আবেদন জানিয়েছে


keya