৫:১৩ পিএম, ২৩ মে ২০১৮, বুধবার | | ৮ রমজান ১৪৩৯

South Asian College

ডিজিটাল ও আধুনিক নারী শিক্ষার পথিকৃৎ

শ্রীপুরে শিক্ষায় অনন্য আবেদ আলী গার্লস্ হাইস্কুল

১৭ মে ২০১৮, ০৯:২০ এএম | মুন্না


আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি : শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত ।  মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা, বিশেষ করে নারী শিক্ষা।  আর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন পুরুষের পাশাপাশি সুশিক্ষিত নারী জনশক্তি। 

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ মেধা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরী করা মাধ্যমিক শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্য।  শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে যেমন সাহায্য করে তেমনই মানুষকে তার মৌলিক স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতনও করে থাকে।  এ ছাড়া প্রাথমিক স্তরে অর্জিত শিক্ষার মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা সম্প্রসারিত এবং সুসংহত করার মাধ্যমে উচ্চতর শিক্ষার যোগ্য করে তোলাও এই মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার উদ্দেশ্য। 

জ্ঞানার্জনের এ প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিজের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত পটভুমির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক করে তোলাও মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম বিবেচনার বিষয়ও বটে।  ইসলাম ধর্মের মানবতাবাদী জীবনাদর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম, সততা, সহনশীলতা, ন্যায়নিষ্ঠা, উদারতা, শ্রমের মুল্যায়ন ও মর্যাদা, পরিবার ও সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক জীবন-যাপন ও সাম্যের চেতনায় উজ্জীবিত হয় এমন দিক বিবেচনায় রেখে ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার যথাযথ মূল্যায়নসহ আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে নারী শিক্ষার পথিকৃৎ শ্রীপুরের আবেদ আলী গার্লস্ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠা। 

মেধা, মননশীলতা, লেখাপড়ায়, এসএসসি ও জেএসসি ফলাফলে ইর্ষণীয় স্থান দখল করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরেই।  বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পিছনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা যায় স্বাধীনতার পরে দীর্ঘকাল কাগজে-কলমে শিক্ষাদীক্ষার হার বাড়লেও প্রকৃত শিক্ষার মান ছিল হতাশাজনক। 

এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার অধঃগতির কারণে বিশেষ করে মেয়েদের হেলা-ফেলার চোখে দেখার কারণে এলাকাবাসীর চাহিদা ও দাবির মুখে শ্রীপুর পৌরসভাধীন বেড়াইদেরচালা গ্রামে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পার্শ্বে আলোকিত সমাজ ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে নারীর মুল্যায়ন বৃদ্ধির জন্যে স্থানীয় বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, দানবীর, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মালেক মাস্টারের দানকৃত ৫৫ শতাংশ জমির উপর স্থানীয় একদল টগবগে শিক্ষিত সুস্থ উদ্যোগী তরুণদের সাথে নিয়ে শ্রমজীবি মানুষের সহায়তায় ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকদের তত্বাবধানে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হয় আবেদ আলী গার্লস্ হাইস্কুল। 

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকা ২০০৯ সালে স্কুলটির পাঠদানের অনুমতি দেয় এবং ২০১২ সালে স্বীকৃতি দেয় ।  ২০১১ সালে প্রথম জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় স্কুলের নামে অংশগ্রহন করে শুরু থেকেই সম্মান জনকহারে জিপিএ-৫ নিয়ে শতভাগ উত্তির্ণ হয়।  ২০০৪ সালে অত্র প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হলেও অদ্যাবধি শিক্ষকদের সরকারী অংশের বেতন বা এমপিও (মান্থলী পেমেন্ট অর্ডার) হয়নি।  এমপিও না থাকার পরেও স্কুলের শিক্ষকবৃন্দের শিক্ষার্থীদেরকে লেখা-পড়ায় কোন ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ করতে পারেনি স্কুল সংশ্লিষ্টরা।  শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতন-ভাতা দিয়ে শিক্ষকবৃন্দের সম্মানী এবং স্কুলের বিভিন্ন খরচ চালানো হয়।  জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ৭/৮ বছরে শতভাগ ও ইর্ষণীয় শীর্ষস্থান নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান সম্মানের সাথে ধরে রেখেছে।  ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এ যাবত ৭ বছরে জেএসসি পরীক্ষায় ৫৪২জন পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে এবং শতভাগ পাশ সহ ২৪৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে ও তাদের মধ্যে ৯৪ জন বিভিন্ন গ্রেডে সরকারি বৃত্তি পেয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। 

এসএসসি পরীক্ষায় ২০১১-২০১৮ পর্যন্ত ৮ বছরে অংশগ্রহনকারী ৪১০জন থেকে ১৩৬জন জিপিএ-৫ সহ সম্মানের সাথে শীর্ষস্থান ধরে রেখে দিয়েছে। 

স্কুলের ছাত্রী অর্পিতা রায় শ্রেয়া, সোনিয়া আক্তার, জোহরা আক্তার, ফাইয়াজ ফারুকী মৌশী জানায়, স্কুলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের কারণে সময় বেশী পাওয়া যায় বিধায় পড়াগুলো অতি সহজে আয়ত্বে চলে আসে এবং দিনের পড়া দিনে শেষ করা যায়।  আমাদের স্কুলের মাল্টিমিডিয়ায় শিক্ষা ও ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করার কারণে পরীক্ষায় আমাদের কারোরই বাইরের বা কোচিংয়ের সহযোগীতা নিতে হয়না বিধায় আমাদের স্কুলের আশ-পাশে কোন কোচিং সেন্টারও নেই।  যেহেতু অত্র স্কুলের শিক্ষকরা সকাল ৮টা থেকে ৩টা পর্যন্ত নিয়মিত নির্ধারিত ক্লাস নেয় ও বিরতি দিয়ে ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিশেষ নজরদারীর পাঠদানে ব্যস্ত থাকে তাই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে হয়না এবং শিক্ষকরাও প্রাইভেট পড়ায়না।  অত্র স্কুলে মেয়েদের জন্য একশত সজ্জাবিশিষ্ট একটি হোস্টেল আছে।  হোস্টেলে অবস্থানরত ছাত্রী ওমামা হোসেন দোলনা, আরিফা আক্তার লাবণী, মাহমুদা আক্তার সীমা, সাবিকুন নাহার জানায় হোস্টেলের তদারকীতে রয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও পরিচালক মন্ডলী।  মেয়েদের সু-স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে একটি মেডিকেল টিম রয়েছে তারাই মেয়েদের টিকা প্রদান, মাসিক চেক-আপ ও  প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। 

এলাকাবাসী জানান, ৭৯ সদস্যবিশিষ্ট ৪টি কমিটি রয়েছে, যার মধ্যে ১টি ১২ সদস্যবিশিষ্ট গভর্ণিং বডি, ১টি ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, ১টি ১৬ সদস্য বিশিষ্ট পিটিএ (অভিভাবক-শিক্ষক) কমিটি ও ৭ সদস্য বিশিষ্ট স্টুডেন্ট ক্যাবিনেট কমিটির সবাই একসাথে বসেই মিটিং করেন। 

স্কুলের দাতা ও গভর্ণিং বডির সদস্য প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার তাজুল ইসলাম জানান, আমাদের আবেদ আলী গার্লস্ হাইস্কুলে রেইনি সিজন, উইন্টার সিজন, সামার সিজন কিংবা হাফ ডে বা হাফ স্কুল নেই।  এই স্কুলে সরকারী দিবস উদযাপন, ধর্মীয় ও বিনোদনমুলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করে থাকে।  উচ্চ শিক্ষিত-অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক মন্ডলীদ্বারা আধুনিক যন্ত্র ও শিক্ষা-উপকরণ দিয়ে শ্রেণী কক্ষে দিনের পড়া দিনেই শিখিয়ে দেয়।  স্কুলের শিক্ষক মোঃ আজিজুর রহমান কামাল, মোঃ দুলাল মিয়া, সাহিদা আক্তার জানান, অত্র স্কুলের শেণি কক্ষ, শিক্ষক মিলনায়তন, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাবের অপেক্ষাকৃত স্বল্পতা থাকা সত্বেও দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া  ছাত্রীদের বিশেষ নজরদারীর মাধ্যমে বাড়তি সময় দিয়ে পড়া শিখিয়ে দেয়া হয়। 

এতে তাদের নিকট থেকে মাসিক ধার্যকৃত বেতনের বাইরে কোন বাড়তি ফি-বেতন বা টাকা নেয়া হয়না।  স্কুলের পিটিএ সভাপতি মোঃ আবুল কাশেম জানান, সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রনালয় ২০১০ সাল থেকে প্রতিটি স্কুলে পিটিএ গঠনের প্রক্রিয়া চালুর কথা বললেও অত্র বিদ্যালয়ে ২০০৬ সাল থেকেই পিটিএ (অভিভাবক-শিক্ষক) কমিটি, ২০১১ সাল থেকে প্রতি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের কথা বললেও ২০০৮ সাল থেকেই মাল্টিমিডিয়া চালু আছে। 

এ ব্যাপারে আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক এবং প্রধানমন্ত্রির এটু আই প্রকল্পের জেলা এম্বাসেটর মো: হাবিবুর রহমান জানান, শ্রীপুরে আবেদ আলী গার্লস হাই স্কুলই প্রথম ডিজিটাল স্কুল হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।  শিক্ষার্থীরা ভিডিও চিত্র দেখে দ্রুত ক্লাস শেষ করতে পারে বলে ক্লাসের পড়া বেশী রিভাইস দিতে পারে এবং তাদের ক্লাসের পরে খেলা-ধুলার সুযোগ থাকে।  প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিয়মে ছাপানো ডায়েরী ও বর্ষ পরিকল্পনানুযায়ী পাঠদান করা হয় যাহা অভিভাবকদের জন্য পর্যবেক্ষনের সুযোগ থাকে।  ২০১১ সাল থেকে স্কুল ম্যানেজমেন্ট সওফটওয়্যার চালু করা হয়েছে ।  তাই আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাদের হাজিরা এবং বাড়ি ফেরার সময়-ক্ষণ জানান দিতে পারে। 

তাদেরকে নির্ধারিত পোষাকেই যথাসময়ে বিদ্যালয়ে হাজির হতে হয়।  সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিতে হয়।  নোট বই এবং প্রাইভেট পড়া নিষেধ।  মেধা ও শতভাগ উপস্থিতির জন্য পুরষ্কার দেয়া হয়।  অতিরিক্ত ফি বা কোচিং ফি ছাড়াই অস্টম ও দশম শ্রেণীর ছাত্রীদের অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া হয় বিধায় স্কুলের ফলাফল ভালো হয়।  গভর্ণিং বডির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ আব্দুল মালেক মাস্টার বলেন , শিক্ষকতা থেকে ২০০০ সালে অবসর গ্রহণ করার পর থেকেই চিন্তা করছিলাম অবহেলিত মেয়েদের জন্য একটি আদর্শ নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার।  সেমতে স্থানীয় উদ্যোগী লোকজন ও তরুণ প্রজন্মের সহায়তায় এই স্কুলটি ২০০৪ সালে আমার পিতা আবেদ আলীর নামে দাঁড় করালাম।  ফলাফল যাচাই-বাছাইয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি উপজেলায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে। 

তিনি ইত্তেফাককে বলেন , জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও আমরা এর অনেক আগে থেকেই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছি।  সকল কর্মকান্ডে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হলে একজন দিনমজুরের সন্তানও উচ্চশিক্ষা অর্জনে সক্ষম হবে।  বর্তমানে এলাকার প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদার প্রেক্ষিতে অত্র স্কুলটিকে মাধ্যমিক থেকে উন্নিত করে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে রূপান্তরের প্রয়াসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। 

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা আকতার জানান, আবেদ আলী গার্লস্ হাইস্কুল শ্রীপুর উপজেলার মধ্যে নারী শিক্ষা বিস্তার এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একটি অনন্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।  তাদের উত্তোরোত্তর উন্নতি কামনা করছি ।  ডিজিটাল সাইডে কিভাবে সারা বাংলাদেশে আরো ভাল করা যায়, সেই ব্যাপারে আরো বেশী প্রতিযোগী হয়ে উঠতে হবে, শিক্ষকদের আরো আধুনিক মন-মানষিকতায় উন্নত হয়ে শিক্ষা প্রদান করতে হবে। 

Abu-Dhabi


21-February

keya