৬:৪২ এএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৯ মুহররম ১৪৪০


মহাদেবপুরে ওসির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

১৪ জুন ২০১৮, ০৫:৪০ পিএম | সাদি


আব্দুল মান্নান, নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর মহাদেবপুরের ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের গরু চুরির মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।  এ ছাড়াও গ্রেফতারকৃতদের পরিবার লোকজনদের বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলে মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। 

তবে ওসি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গরু চোরদের কল লিষ্ট দেখে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।  ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন উপজেলাবাসি। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার চকদৌলত গ্রামের মৃত বখতিয়ার তরফদারের ছেলে আব্দুল লতিফ তরফদারের ২৯ মে সন্ধ্যায় চারটি গরু চুরি হয়।  ঘটনায় পর দিন আব্দুল লতিফ তরফদার থানায় একটি সাধারণ ডায়রি দায়ের করা হয়। 

এরপর পুলিশ গরু চোর সন্দেহে ৭ জুন রাতে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মো.তৈমুদ্দিন, সামছুল আলম, মো. পিন্টু, আবু সাঈদ, আক্কাস আলী, আতিকুর রহমান এবং মুরাদ হোসেন নামে ৭জনকে আটক করে পুলিশ।  এরপর আটককৃতদের গরু চুরির সাথে জড়িত এবং কে কে জড়িত এমন তথ্যের দেয়ার জন্যে থানা হেফাজতে মারপিট করা হয়।  পুলিশের মারপিটেও তাদের কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে বিপাকে পরে পুলিশ। 

এমতাবস্তায় ওসি মিজানুর রহমান গরু উদ্ধারের আশ্বাস দিয়ে ৮জুন আব্দুল লতিফ তরফদারকে বাদি করে অজুনী গ্রামের মৃত মহি উদ্দিনের ছেলে মো.তইমুদ্দিন(৫০), দেওয়ানপুর গ্রামের মৃত রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে সামছুল আলম(৪৩), জন্তিগ্রামের আকরাম হোসেনের ছেলে মো: পিন্টু(৩২), চেরাগপুর গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে আতাউর রহমান ওরফে শান্ত (৩০), বাগদান গ্রামের মৃত আলী আকবরের ছেলে আবু সাঈদ (২৮), পদ্মপুকুর গ্রামের তামিজ উদ্দিনের ছেলে আক্কাস আলী(৪২), রহাট্টা গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে আতিকুর রহমান(২২), আতিকুর রহমানের ভগ্নিপতি ধামইরহাট উপজেলার রামপাশা গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে মুরাদ হোসেনসহ (৩০) আরো ৪/৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করিয়েছেন।   

মামলা বাদি আব্দুল লতিফ তরফদার জানান, ২৯ মে সন্ধ্যায় চারটি গরু চুরি হওয়ায় থানায় একটি সাধারণ ডায়রি দায়ের করা হয়।  এরপর ৮জুন থানার ওসি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে থানা পুলিশ এসে তার চুরি হওয়ার সাথে সাত জন গরু আটক করা হয়েছে।  এ জন্যে তাদের রিমান্ডে নেয়া দরকার।  তাদের রিমান্ডে নিলে গরুগুলো উদ্ধার করা সম্ভব এমন আশ্বাস দিয়ে কোন কিছু বোঝার আগেই দ্রুত আট জনের নাম উল্লেখ আরো অজ্ঞাত ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা কাগজপত্র নিয়ে স্বাক্ষর করে নেন।  তবে এখন পর্যন্ত তার কোন উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। 

আটককৃতদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গরু মিথ্যা দায়ের করা মামলার আসামীদের ব্যাপক মারপিট করা হয়েছে।  মারপিট করে তাদের আদালতে সোপর্দ করার পর বিজ্ঞা বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়ার মারপিট ও চাপ দেয়া হয়। 

উপজেলার রহট্টা গ্রামের আতিকুর রহমানের মা আকলিমা খাতুন জানান, তার স্বামী আজিজুল হক এক সময় চোর ছিলেন।  ১৯৯৪ সাল থেকে চুরি পেশা ছেড়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতেন।  বর্তমানে তার প্রায় ৭০ বছর বয়স।  তার এক পা ভেঙ্গে তেমন কোন কাজ করতে পারেন না।  পুলিশের তালিকায় আজিজুল হকের নাম থাকায় পুলিশ তাকে আটক করতে তার গ্রামের বাড়িতে ৬ মে রাতে।  আজিজুল হককে না পেয়ে তার ছেলে টমটম চালক আতিকুর রহমান ও তার জামাই মুরাদ হোসেন আটক করে থানায় ব্যাপক মারপিট করা হয়েছে বলে তাদের পরিবার অভিযোগ করেন।  

মুরাদ হোসেনের খালা মোছা. মঞ্জু জানান, তারা কেউ চুরি পেশার সাথে জড়িত না।  তাদের পুলিশ জোর করে তুলে এনে থানায় ব্যাপক মারপিট করেছে। 

গরু চুরির মামলায় আটক হওয়া আরেক আসামী বাগদান গ্রামের ধান ব্যবসায়ী আবু সাঈদ।  তাকেও একই রাতে করে থানা পুলিশ। 

আটককৃত ধান ব্যবসায়ী আবু সাঈদের পরিবার ও গ্রামবাসি জানিয়েছেন, আবু সাঈদ গরু চুরির সাথে জড়িত ছিলেন না।  তিনি ধান ব্যবসার এনজিও’র কাজ করেন।  এরপর থানার ওসি মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ হয়।  আবু সাঈদ গরু চুরির সাথে জড়িত নয় বলে তাকে ওসি ছেড়ে দেবেন বলে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন।  এরপরও সাঈদ চুরির সাথে জড়িত এবং এর সাথে কে কে জড়িত এমন তথ্যে দেয়ার জন্যে থানায় ব্যাপক মারপিট করা হয়েছে।  এমন কি সাঈদ যেন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্ধী দেন এর জন্যেও তাকে ব্যাপক মারপিট করা হয়েছে। 

পরিবারের লোকজন আরো জানান, এ ব্যাপারে কোন সাংবাদিকদের কাছে কোন রকম তথ্য দিলে তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়।  পুলিশের হুমকিতে পরিবারের লোকজন আতঙ্কে রয়েছেন।   
বাগদান গ্রামের আশেখান এলাহী জানান, পুলিশের হাতে আটক ধান ব্যবসায়ী আবু সাঈদ সৎ ছেলে হিসেবে ছেড়ে দিবে বলে ওসি মিজানুর রহমান তাদের পরিবার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন।  এরপরও সাঈদকে মারপিট করে গরু চুরি মামলায় অন্যদের সাথে ৯ জুন আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে সোপর্দ করা হয়েছে। 
চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিবনাথ মিশ্র জানান, আবু সাঈদ ধান ব্যবসায়ী বলে জানা রয়েছে।  তিনি গরু চুরির সাথে জড়িত বলে কোন তথ্য নেই তার কাছে।  তবে তার জানার বাহিরেও কিছু থাকতে পারে।  তিনি আরো জানান, ঘটনা যাই হোক না কেন সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দাবি জানান স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি। 

ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আটককৃতরা গরু চুরির সাথে জড়িত।  তাদের সেল ফোন ট্রাকিং করে আটক করা হয়েছে।  অপর প্রশ্নে তিনি জানান, বাপ চোর হলে ছেলে কি করে ভালো হয় ?

পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।  কেউ অন্যায় করে ছাড়া পাবেন না।