৭:৫৮ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, শুক্রবার | | ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তার সেলফি ভাইরাল

১০ জুলাই ২০১৮, ০৮:১২ পিএম | মাসুম


মো.আখলাকুজ্জামান, গুরুদাসপুর প্রতিনিধি : পঞ্চাশ শয্যা বিশিষ্ট নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুজাহিদুল ইসলাম।  দীর্ঘদিন ধরে তিনি হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। 

হঠাৎ তিনি একজন মুমূর্ষ মহিলা রোগীর পেটের ওপরের ও নিচের অংশের কাপড় খোলা অবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করার সময় স্মার্টফোনের মাধ্যমে সেলফি তুলে জীবন চৌধুরী নামের এক ফেসবুক একাউন্টে পোষ্ট করেন।  ফলে সেলফি বা ছবিটি ভাইরাল হলে ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে কর্তব্যহীনতার অভিযোগ উঠেছে। 

অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে,- গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তা ডা. মো. মুজাহিদুল ইসলাম নিজের জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে কাজের ফাঁকে রোগীদের সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে ছেড়ে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। 

প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে ভেঙ্গে পড়েছে হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা।  হাসপাতালের জরুরী ও আউটডোর
বিভাগের সামনে গুরুদাসপুর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী বড়াইগ্রাম, চাটমোহর, সিংড়া ও তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন
রোগাক্রান্ত রোগিদের প্রকট ভীড়। 

অথচ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬ জন অভিজ্ঞ চিকিৎসক কর্তব্যরত থাকার কথা।  কিন্তু মাত্র ৪ জন মেডিকেল অফিসার দিয়ে সরকারি হাসপাতালটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। 

ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চক্ষু বিশেষজ্ঞ, সার্জারী বিশেষজ্ঞ, কার্ডিওলজিষ্ট ও নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিসৎক থাকার বিধান থাকলেও এসবের কোন বালাই নেই।  জরুরী বিভাগের অফিস সহকারিও নেই।  ঝাড়–দার ৫ জনের মধ্যে রয়েছে ৩ জন।  নিরাপত্তা প্রহরী ৩ জরেন মধ্যে রয়েছে মাত্র ১ জন।  সেখানে কোন সার্জারী বিশেষজ্ঞ নেই বলে রোগীকে অবসকারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও নিয়োগ দেয়া হয়নি। 

বিধিমোতাবেক ৯ জন কনসালটেন্ট, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, অর্থপেডিকস, গাইনী বিভাগের চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও মাত্র ৪ জন কনসালটেন্ট দিয়ে চলছে ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।  হাসপাতালে ল্যাব এ্যাসিসটেন্টও নেই।  ইপিআই বিভাগেও অদক্ষ
এক টেকনিশিয়ান দ্বারা কাজ চালানো হচ্ছে।  এমনকি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়নি।  দীর্ঘদিন যাবৎ কর্তব্যরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মেডিকেল অফিসাররা আগত রোগীদের আল্ট্রাসনোগ্রাম করে আস্বস্ত করে চলছেন।  এছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটিমাত্র এক্স-রে মেশিন এক যুগ ধরে বিকল হয়ে জলহস্তির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে।  আবার অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে মেডিকেল অফিসাররা বিভিন্ন ক্লিনিকে বেশি সময় দিচ্ছেন।  ফলে হাসপাতাল কর্মকর্তা ডা. মো.মুজাহিদুল ইসলাম একাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে চলেছেন। 

সেই সাথে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য মুমূর্ষ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার সময় স্মার্টফোনের মাধ্যমে সেলফি তুলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।  এদিকে ডাক্তারের অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে স্থানীয় ও বহিরাগত মুমূর্ষ রোগীরা চরম ভোগান্তি আর বিভ্রান্তির শিকার হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। 

ভাইরাল হওয়া নিয়ে ডা. মো. মুজাহিদুল ইসলাম ফেসবুকে সেলফি পোষ্ট করার কথা স্বীকার করে বলেন, ওই মহিলা রোগীর নিজ ইচ্ছায় ও নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য চিকিৎসা দেয়ার সময় রোগীর সাথে ছবি উঠেন এবং তা ফেসবুকে পোষ্ট করেন।  কিন্তু ছবিটি ফেসবুকে ছাড়ার পর পরই সমাজে এতটা প্রভাব বিস্তার করবে তা কখনও ভাবা হয়নি।  শখের বসে পড়ে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছি।  তাছাড়া রবিউল করিম শান্ত নামের মেডিকেল অফিসারের ওপর দায়িত্ব দিয়ে তিনি কোনরকমে সম্মান বাঁচাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।  তিনি আরও বলেন,-অধিকাংশ সময় রোগী বহনকারী সরকারি এ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে।  স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন
মহিলা ডাক্তার অত্যন্ত জরুরী।  মুমূর্ষ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নাটোর বা রাজশাহীতে রেফার্ড করতে হচ্ছে। 
রোগী বহনের জন্য বেসরকারি ২-৩ টি ভাড়াটে এ্যাম্বুলেন্স স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গনে সব সময় অবস্থান করে
থাকে। 

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সমাজসেবক সামসুল হক শেখ জানান,- গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পার্শ্ববর্তী ৫টি উপজেলার প্রতিদিন শতাধিক রোগী আসলেও বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে দূর্ঘটনা কবলিত আহত রোগীরাও জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। 

এদিকে অভিমানী বালক অপুর্ব নামের ফেসবুক ব্যবহারকরী ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন- ‌‌‍‍‌্#৩৯;্#৩৯;এর বিচার চাই, এটা কি করতাছে নাটোরে রোগিদের কাপর কোথায়,‘কি বলবো কেমন সেলফি, একটি মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় বিপদে পরে আর এনারা সরোলতার শুজগে সেলফি তুলছেন।  কি বলবো আপনারাই বলুন হাসপাতালে জনবল সংকটের পরিণতি- আল্ট্রাসনোগ্রামের সময় মহিলা রোগীকে কাপড় খোলা অবস্থায় সেলফি তোলেন সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ব্যাপারে পশু ডাক্তার সবুজ বিশ্বাস জানান,- হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তাই যখন ফেসবুকে সেলফি তোলা নিয়ে ব্যস্ত তখন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়াটা স্বাভাবিক।  পর পর ৫ দিন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছেন।  কিন্তু কোন ডাক্তার না থাকায় ঘুরে ফিরে বাড়িতে আসতে হয়েছে তাকে।  গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির উন্নয়নে এ মূহুর্তে সরকারি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। 

এদিকে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহামদ মনির হোসেন বলেন,- স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা হিসেবে ডা. মুজাহিদুল ইসলাম যেভাবে রোগীসহ ফেসবুকে সেলফি পোষ্ট করেছেন তা অত্যন্ত লজ্জাজনক।  তাছাড়া হাসপাতাল কমিটির কোনও মিটিংয়েও উপস্থিতি দেখা যায়নি।  তিনি আরও বলেন- একদিন আমি নিজের সন্তানকে টিকা দিতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম।  হাসপাতালের এমন করুন পরিণতি দেখে সহ্য করা যায় না।  তিনি হাসপাতালটির উন্নয়নের জন্য স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীদের নেক দৃষ্টি কামনা করেন এবং ওই
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে সরাসরি স্বাক্ষাৎকারের পরামর্শ দেন। 



keya