১:৫৯ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ:যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০৯:০১ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : ‘অনুরাগ কুমকুম দিলে দেহে-মনে,
বুকে প্রেম কেন নাহি দিলে?’ (কাজী নজরুল ইসলাম)

‘তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে’ (সুকান্ত ভট্টাচার্য)

কবির ভাষায় বুকে প্রেম না দেয়ার আক্ষেপ ছাপিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কিন্তু এই নিরাশার পটভূমিতে আশার আলো জ্বেলেছে।  এই যেমন ধানমন্ডিতে বাস ভাঙা হয়েছিলো একটা, তাই রাস্তায় গ্লাস পড়েছিলো, বাচ্চারা নিজেই তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে চলাচলের সুবিধার জন্য।  আশা করি, তোমাদের হাতে সমাজের জঞ্জালগুলোও পরিষ্কার হবে! এটাই বিশ্বাস। 

নিরাপদ সড়ক ও বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীকে ‘হত্যার’ বিচারসহ ৯ দফা দাবিতে বুধবার (১ আগস্ট) চতুর্থ দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা।  এসময় বিভিন্ন পয়েন্টে তারা বাস থামিয়ে কাগজপত্র ও ড্রাইভারে লাইসেন্স পরীক্ষা করে।  যেসব গাড়ির কাগজপত্র নেই, সেসব গাড়ি ফিরিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। 

অন্যদিকে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি কাজে নিয়োজিত প্রাইভেটকার, সিএনজি এবং রিকশা নিরাপদে নিজেরাই পার করে দিয়েছে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। 

সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অন্তত ২০টি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও ১২-১৫টি প্রাইভটকার, সিএনজি এবং শতাধিক রিকশা ছেড়ে দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।  এর আগ বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাইন্সল্যাবে অবস্থান নেয় তারা। 

শাহবাগ থেকে উল্টো পথ দিয়ে গাড়ি নিয়ে বাংলামোটরের দিকে যাচ্ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।  এসময় তার পুলিশ প্রোটেকশনও ছিল।  আইন লঙ্ঘন করে উল্টো পথ দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়ায় মন্ত্রীকে ফিরিয়ে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।  গাড়ি ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলে তারা স্লোগান দেয়, ‘আইন সবার জন্য সমান’।  তারুণ্যের শক্তিতে ঠিক পথে ফিরে যেতে হয়েছে মন্ত্রীকে। 

আগের দিন (৩১ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে শাহবাগ থেকে উল্টোপথ দিয়ে গাড়ি নিয়ে বাংলামোটরের দিকে আসা পুলিশের একটি ভ্যান ফিরিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। 

অন্যদিকে দাবি আদায়ের মধ্যেই সারিবদ্ধভাবে রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করে ট্রাফিক পুলিশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই পুচকেরাই।  বুধবার (১ আগস্ট) সাইন্সল্যাবের ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে। 

এ দিন সকাল থেকে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শনির আখড়া, মাতুয়াইল, মেরাদিয়া, বনশ্রী, রামপুরাসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যানচলাচল ছিল খুবই কম।  রাস্তায় গাড়ি কম থাকায় সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে।  তারপরও তাদের মধ্যে ছিলো না কোনো বিরক্তি।  ক্ষুব্ধতা। 

কিন্তু এসবের মধ্যেও মঙ্গলবারের কতিপয় পুলিশি অ্যাকশন যেমন মেনে নেয়া যায় না, তেমনি ব্রেক ফেল করে সরকারি বাস যেভাবে মধুমিতা সিনেমা হলে ঢুকে যাওয়ার ঘটনাটা যে কাউকে ভাবাবে। একইভাবে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমে এক স্কুলছাত্রের কলার চেপে ধরে তাকে যখন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা শাসান, আরেকজন কর্মকর্তা শিশুর গলা চেপে ধরেন তাতে শঙ্কাটা আরও বাড়ে।  

সবশেষে, যখন দেখি রাজধানীর দনিয়া এলাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুকে পিষে চলে যায় একটি পিকআপ ভ্যান তখন বুকের ব্যাথাটা কেবল টন টন করে না, বিষম হয়ে ওঠে।  বুকের ভেতর ফুঁসে ওঠে হয়াদার আলীর আর্তনাদ-
‘কত ব্যথা বুকে চাপালেই তাকে বলি আমি ধৈর্য
নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ
আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার। ’

ভেবে পাই না, এই অমানবিকতার শেষ কেথায়? এই যে আক্রোশ এটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এই দেশকে?

নাহ! সেই অন্ধকার থেকেই নিজেদের রক্ষায় যেন এবার পথে নেমেছে আগামী ভবিষ্যত।  বুক সটান করে দাঁড়িয়েছে সারিবদ্ধ ভাবে।  যেমনটা একদিন দাঁড়িয়েছিলো সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার।  তারা গলা চড়িয়ে বলছে- 'Its wrong side sir, have to go back sir.' আমাদের গালে নিরবে চপেটাঘাত করে বলতে পেরেছে- 'আমরা ৯ টাকায় ১জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই'। 
এতো দিনেও যে কথাগুলো আমরা বড়রা বলতে পারি নি, এই শিশুরাই অকপটে বলে ফেলছে দ্বিধাহীন। 

আশার কথা, স্কুল-কলেজের ছাত্র/ছাত্রীর সঙ্গে তাদের মা, বাবা, ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন সহ পুরো জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ।  সঙ্গে আছে সুবোধ পুলিশও।  দেখেছি গোলাপ হাতে।  এবার হয়তো শিশুর হুঙ্কারে ঘুম ভাঙবে বড়দের।  ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে আমাদের সবুজঘেরা এই স্বাধীন ব-দ্বীপ।  তাই এই শিশুদের আমি পুচকে বলতে নারাজ।  আমার কাছে- ‘ওরাই বাংলাদেশ’। 

ইতিহাসের পাতাতে চোখ বোলালেই হয়।  ৫২-র আগে, ৭১-এর আগে বিস্তীর্ণ পটভূমি আছে।  পড়ে পড়ে মার খেতে খেতে একদিন সবাই মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।  এই শিক্ষার্থীরা সেই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়।  মনে করিয়ে দেয়, ১৪৪ ধারা জারি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসা।  যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি।  চাটুকারদের কখনো ইতিহাস মনে রাখে না, স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া সামান্যদের কেউ ইতিহাসের পাতায় জায়গা দেয় না।  তাই এখানে টিকতে হলে তেলাপোকার মতো শুধু পড়ে থাকলেই চলে না, ডাইনোসরের মতো প্রকাণ্ড হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে হয়। 

সময়ের টাইম লাইন দেখে আমার আশঙ্কা, আগামীতে এই পথের নিরাপত্তা কলেবরে আরও বাড়তে পারে।  নিরাপত্তার প্রশ্নে স্কুল ছুটি দিয়ে কী সমাধান হবে? এরপর যদি এই বাচ্চারা তাদের বাপ-চাচাদের দুর্নীতির চাদর ধরে একটা হ্যাচকা টান দেয় তখন কী হবে? কী ভাবে রক্ষা হবে আব্রু? খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, পেশায় ভেজাল, সংস্কৃতিতে ভেজাল, সবকিছুতেই যখন ভেজালের জয়জয়াকার, খারাপের বাজার দর উর্দ্ধমুখী তখন স্কুল ছুটি দিয়ে কী সমাধান হবে? নাকি শাহজাহান খানের পর নতুন বিড়ম্বনায় জড়াবেন শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ।  কেননা গত তিন দিনে তার টিকিটিও দেখা পায়নি এই শিক্ষার্থীরা।  অথচ তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে এই মন্ত্রীরাই কিন্তু পারতেন ব্যথা প্রশমন করতে! 

তা না করে বৃহষ্পতিবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলো।  এর মানে কিন্তু এটা নয় যে ছাত্র ছাত্রীরা বের হয়ে আসবে না।  এর অর্থ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও তারা বেরুলে তাদের ধরা হবে।  ইউনিফর্ম ছাড়া যারা আসবে তাদেরই আরো আগে ধরা হবে।  এরই ফাঁক গলে বহিরাগতদের এই আন্দোলনে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।  তৈরি হবে নতুন কোনো নৈরাজ্য।  মতভেদের জন্ম দিয়ে পুরো আন্দোলনটাই প্রশ্ন বিদ্ধ হবে।  তবে এ আন্দোলন কিন্তু থামবে না।  নতুন আবহে বাধা পেয়ে আরও  গতিশীল হবে।  কেননা এই পুচকেরা ডিজিটাল থেকে ফিজ্যিকালি উচ্চারণ করছে- যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ।  একই সঙ্গে বৃষ্টি মাথায় অহিংস আন্দোলন ও নতুনত্বের মাধ্যমে সেই স্বাক্ষরও রেখে চলেছে। 

লেখক: ইমদাদুল হক। 

সাংবাদিক, কলামিস্ট