৭:২১ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১৪ মুহররম ১৪৪০


গাইবান্ধার নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগারটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:২৯ এএম | জাহিদ


তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা প্রতিনিধি : বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপে দেশের স্মৃতি সম্বলিত ঐতিহ্য সম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠান আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমুল পরিবর্তন হলেও গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার নলডাঙ্গার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শহীদ মিনার সংলগ্ন নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থগারটি অযত্নে অবহেলায় আর সরকারের নেক দৃষ্টির অভাবে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলছে।  এ অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র  স্মৃতি গ্রন্থগার। 

বিশেষ সুত্রে জানা গেছে ১৯৪১ সালের ১০মার্চ ভবানী প্রসন্ন তালুকদারের উদ্যোগে এই গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  সে সময় এটি পরিচালনার জন্য স্থানীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট একটি গঠন করা হয়েছিল।  কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভবানী প্রসন্ন তালুকদারের পিতার নামানুসারে গ্রন্থগারটির নামকরণ করা হয় নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার। 

ওই কমিটির উদোগে বৃহত্তম রংপুর জেলা বোর্ডের জমিতে এই গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়।  ওই সময় গ্রন্থাগারের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন গাইবান্ধা সার্কেল অফিসার সুকুমার চক্রবতী।  মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রয়াত আ. রশিদ সরকারের ব্যক্তিগত  উদ্যোগে ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত পৃষ্টপোষকতায় এটি আবারো নতুন করে নির্মাণ করা হয়।  সত্তর দশকে এই গ্রন্থগার অত্র এলাকার ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সমাজ সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে সাহিত্য অনুরাগী হতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। 

বিশেষ করে ওই সময়ের তরুণ সমাজের মাঝে নবরুপে নব উদ্যোমে সাহিত্যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল ।  আশির দশকে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ ৩টি গ্রামীণ গ্রন্থাগারের মধ্যে নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার ছিল প্রথম।  এছাড়া তৎকালীন আরো দুটি সমৃদ্ধি গ্রন্থাগার হলো রংপুর জেলার পাওটানা গ্রন্থাগার, ও নীলফামারী জেলার ডোমার গ্রন্থাগার। 

শুধু সাহিত্য চর্চায় এই গ্রন্থাগারটি সীমাবদ্ধ ছিল না।  সারা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দিবসে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষকে অনুপ্রাণিত করত এই গ্রন্থাগার ।  কিন্তু ২০০০ সালের শুরুতে নানাবিধ সমস্যার বেড়াজালে আটকে যায় এই গ্রন্থাগারের অগ্রযাত্রা। 

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, ২০০০ সালে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ভবনটি সংস্কার ও বই কেনা বাবদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।  ইহাই ছিল সর্ব শেষ সরকারি বরাদ্দ।  বৃটিশ আমলে স্থাপিত ১তলা বিশিষ্ট এক সময়ের সৌন্দর্যবর্ধন এ স্মৃতি গ্রন্থগারটি আজ অযত্নে আর অবহেলায় কঙ্কালসার ভবনে পরিনত হয়ে শুধু কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভবনটির চারিদিকে ঝোঁপ জঙ্গলে ঘিরে গেছে।  গোটা ভবনটির চারপাশে স্যাঁতস্যাঁতে আকার ধারন করে দেয়ালের বালি ও সিমেন্ট খসে পড়ে বিবর্ণ হয়েছে। 

শুধু তাই নয় উপরের ছাদটিতে বিভিন্ন ধরনের আগাছায় জন্মে ছেঁয়ে গেছে।  ফলে ছাদ সহ পুরো ভবনটি ফাটল ধরে বৃষ্টির পানি পড়ে পরিত্যক্ত ভবনে রুপ নিয়েছে।  যে কোন মুহুর্তে বেহাল দশার ভগ্নদশার এ ভবনটি ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। 
বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি গ্রন্থাগারটি আশে পাশে এখন ময়লা আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থান হিসাবে ব্যবহার করছেন। 

এমনকি নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র স্মৃতি  গ্রন্থাগার খোদাই করে লেখা নামটিও মুছে গেছে ।  ফলে এ অঞ্চলের তরুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেনা এ ভবনটি কিসের। 

নলডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সরকার বলেন, এক সময় আমরা দেখেছি এ গ্রন্থাগারটিতে অনেক শিক্ষানুরাগী, সাহিত্যনুরাগী ও গুণীজন এসে বই পুস্তক পড়তেন।  তাদের পদচারণায় ওই সময় গ্রন্থাগারটি বেশ মুখরিত ছিল। 

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিয়া হাফিজ বলেন, আমিও একসময় স্মৃতি বিজড়িত এ গ্রন্থাগারিটর সাথে জড়িত ছিলাম।  স্থানীয় কিংবা সরকারী ভাবে গ্রন্থাগারটির কোন গুরুত্ব না থাকায় ক্রমান্বয়ে আজ গ্রন্থাগারটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মুখোমুখি হলেও দেখার যেন কেউ নেই।  তাই সরকারী বা বেসরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে এটি আবারো হয়তো প্রাণচাঞ্চল্যে হয়ে উঠতো বলে আমি মনে করি। 

এদিকে গ্রন্থাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবার পর গ্রন্থাগারের ভিতের সংরক্ষিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই, বাদ্যযন্ত্র, আসবাব পত্র সবই রাতারাতি হাওয়া হয়ে যায় ।  কে বা কারা সব কিছু গায়েব করায় এ সবের আর কোন হদিস মিলেছ না ।  এখন পর্যন্ত গ্রন্থাগারটি সংরক্ষণ বা সংস্কারে কোন সংগঠন কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি । 

এমতবস্থায় এ অঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের জন্য এই সামজিক সম্পদটি রক্ষার লক্ষে সমাজের তথা দেশের উচ্চ বিত্তশালী, সামাজিক সংগঠন ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষজন। 


keya