২:০৩ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার | | ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ট্রলার ডুবি

মাদারীপুরে নিহত ২ জনের পরিবারে আহাজারী, নিখোঁজ-৭

১৬ মে ২০১৯, ০৪:২৯ পিএম | জাহিদ


মাতুব্বর শফিক স্বপন, মাদারীপুর : দালালদের খপ্পরে জিম্মি হয়ে সাগর পথে লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ট্রলার ডুবির ঘটনায় মাদারীপুরের নিহত জাকির হোসেন (২৮) ও সজিব হোসেনের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। 

নিহত জাকির হোসেন শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৮নং চর গ্রামের সেকান্দার হাওলাদারের ছেলে এবং সজিব হোসেন সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের উত্তর শিরখাড়া গ্রামের আজিজ শিকদারের ছেলে।  নিখোঁজ রয়েছে সদর উপজেলার মনির হোসেন মাতুব্বর (২২), নাদিম মাতুব্বর (১৭), সাইফুল ইসলাম (২৪) সায়েদ কাজী (৩০), স্ব পন মল্লিক (২৭), সাইফুল (২৮) ও রাজৈর উপজেলার নাঈম সিকদার (১৯) নামের ৭ যুবক। 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে অর্থ উপার্জনের জন্য নূর-নবী খলিফা ও নূর ইসলাম খলিফা নামের দুই দালালের হাত ধরে বিদেশে পারি জমায় জাকির।  জাকিরকে স্থলপথে তুরস্ক নেওয়ার কথা থাকলেও দালাল চক্র লিবিয়া নিয়ে জিম্মি করে।  লিবিয়ায় জাকির হোসেনকে আটকে রেখে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা দাবী করে তারা।  টাকা দিতে অস্বীকার করলেই ছেলেকে বিক্রি করে দিবে অথবা অনাহারে রাখবে বলে হুমকি দিতে থাকে।  এ পর্যন্ত পরিবার প্রায় ৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দালালচক্রের কাছে দেন। 

বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে লিবিয়ার উপকুল থেকে ৭৫ জন অভিবাসী নিয়ে ইটালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া ট্রলার ডুবিতে নিহত হন জাকির হোসেনসহ ২৭ বাংলাদেশী।  জাকির হোসেনকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের লোকজন।  স্বামীকে হারিয়ে কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের।  অবুঝ দুটি কন্যা সন্তানকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের।  এদিকে সন্তান ট্রলার ডুবিতে নিহত হওয়াকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছেনা নিহত জাকিরের বাবা-মামা।  

এদিকে সজিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে মানুষের ভিড়।  সজিবের মা ও বোন যেন একটু পর পরেই সজিবের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেই যাচ্ছে।  সজিবের মা মোবাইল হাতে নিয়ে বারবার বলছিল যে তার সাথে ছেলে সজিবের শেষ কি কথা হয়েছিল।  তাঁর ছেলে আর বেঁচে নেই এটি কিছুতেই যেন মানতে পারছে না এই মা।  শোকময় পরিবারটি এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যেও বইছে শোকের মাতম। 

সজিবের স্বজনরা জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই গত ঈদের পরের দিন এক দালালের হাত ধরে লিবিয়া যায় সজিব।  এরপর লিবিয়াতে ছয় মাস কাজ করার পরে নোয়াখালীর রুমান নামে এক দালালের খপ্পরে পরে সজিব।  সেই দালাল আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে সজিবকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে।  সজিব রাজি হয় তার সাথে যেতে।  এরপর দালাল টাকা আটকে রেখে সজিবকে লিবিয়ার জিম্মি দশায় বন্দি করে রাখে।  এরপর দীর্ঘ চার মাস পরে গত বৃহস্পতিবার সজিবকে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া পৌছানোর কথা বলে সজিবকে নৌকা তোলা হয়। 

সজিবের বোন মিম আক্তার বলেন, ‘আমারে আফা কইয়া আর কে বোলাবো।  আমার ভাইরে এক বছর রাইখা কেন বৃহস্পতিবার পাঠাইলি।  আমি এহন কেমনে ভাইরে ভুইলা থাকমুরে।  কোথায় গেলি সজিবরে।  আমি আমার ভাইয়ের না দেখা পর্যন্ত রোজা ভাঙ্গমু না। ’

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মাদারীপুরের সাত জন এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন।  এরা হলেন সদর উপজেলার বল্লভদী গ্রামের আদেল উদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে মনির হোসেন মাতুব্বর (২২) ও শ্রীনদী এলাকার জোবায়ের মাতুব্বরের ছেলে নাদিম মাতুব্বর (১৭), খোয়াজপুর মঠেরবাজার এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৪), মস্তফাপুর ইউনিয়নের খাকছাড়া গ্রামের আনোয়ার মল্লিকের ছেলে সায়েদ মল্লিক(৩০), মানিক মল্লিক ছেলে স্বপন মল্লিক(২৭) ও একই এলাকার সাইফুল ইসলাম (৩০) ও  রাজৈর উপজেলার আলম দস্তার গ্রামের জাফর সিকদারের ছেলে নাইম সিকদার (১৯) নিখোঁজ রয়েছেন।  নিহতদের লাশ দেশে আনার পাশাপাশি নিখোঁজদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনরা।  এছাড়া দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। 

নিখোঁজ স্বপন মল্লিকের বাবা মানিক মল্লিক জানান, আমি প্রথমে সাড়ে সাত লক্ষ টাকা দিয়ে চুক্তি করেছি।  এরপর আমার ছেলেকে আটকে রেখে আরো তিন লক্ষ টাকা নিয়েছে।  ইতালী পৌছে দেয়ার কথা বলে।  এরপর আমি আমার ছেলে ফেরত চেয়ে আরও দেড় লক্ষ টাকা দিয়েছি।  তারপরও আমার ছেলেকে ফেরত পাঠায়নি।  আমি এক দালালের বিরুদ্ধে মামলাও করেছি।  কিন্ত আজ আমার ছেলে জীবিত আছে না মারা গেছে জানি না।  তবে সরকারের কাছে দাবী আমার ছেলে যে অবস্থায় থাকুক আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। 

নিখোঁজ সায়েদ মল্লিকের দাদা বলেন, আমরা অনেক আসা নিয়ে সায়েদকে বিদেশে পাঠিয়েছি।  আমার দাবী আমাদের সায়েদকে ফেরত দেয়া হোক।  আমরা এখনো জানি না সায়েদ কোন অবস্থায় আছে। 

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মাদারীপুর শাখার যুব প্রধান শিশির হোসেন বলেন, তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছে নৌকা ডুবির ঘটনায় এ পর্যন্ত মাদারীপুরের কয়েকজনের নাম জানা গেছে।  এরমধ্যে সজিব নামে একজনের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।  আমরা নিহত ও নিখোঁজদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য নিয়েছি। 

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, ভূমধ্যসাগরে নিহত ও নিখোঁজদের বিষয়ে জেলা প্রশাসন খোঁজ রাখছে।  পরিবারগুলোকে এ বিষয়ে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।