১১:২৬ এএম, ২১ মে ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১৬ রমজান ১৪৪০




ব্যবহারিক পরীক্ষায় হয় টাকা দিতে হবে, অন্যথায় ফেল

১৬ মে ২০১৯, ০৯:৩৮ পিএম | জাহিদ


আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট : ব্যবহারিক পরীক্ষায় হয় টাকা, অন্যথায় ফেল টাকা ছাড়া ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতায় স্বাক্ষর করছেন না করার অভিযোগ উঠেছে লালমনিরহাটের সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের বিরুদ্ধে।  টাকা দিলে ভাল নম্বর, না দিলে কম, প্রতিবাদ করলে ফেল করিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে পরীক্ষার্থীদের; এমন অভিযোগ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। 

পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও কলেজ অফিস জানান, আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজ থেকে চলতি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২৩৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন।  ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জন্য ১০০ নম্বরের তথ্য প্রযুক্তি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়।  এ বিষয়ের পাশ নম্বর ৩৩।  যার ব্যবহারিকে রয়েছে ২৫ নম্বর।  তাই ভাল ফল বা পাশ করতে ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার্থীদের কাছে।  

পরীক্ষার্থী বেশি হওয়ায় এবং পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে শুধুমাত্র তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কলেজের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক গ্রহণ করে কেন্দ্রে নম্বরপত্র পাঠাবেন।  এ জন্য বোর্ড থেকে খরচ বাবদ পরীক্ষার্থী প্রতি ১৫ টাকা হারে পাবেন ওই শিক্ষক।  অপর দিকে ব্যবহারিকের অন্যান্য সকল বিষয়ের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে।  লিখিত পরীক্ষা শেষ হলে লালমনিরহাটের কলেজগুলোতে শুরু হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা।  চলতি মাসেই শেষ করতে হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। 

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক জালাল উদ্দিন প্রতি শিক্ষার্থীর থেকে  ৩০০ টাকা আদায় করছেন।  টাকা না দিলে বা প্রতিবাদ করলে ফেল করিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে।  ফেল করার ভয়ে পরীক্ষা শুরুর আগেই টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।  পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশের আগে এ টাকা জমা দিতে হবে বলে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও জানান শিক্ষার্থীরা। 

শুধু তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে নয় এ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের সকল বিষয়ের সঙ্গে মনোবিজ্ঞান, ভূগোল ও কৃষি বিষয়ে ব্যবহারিকের জন্য নেয়া হচ্ছে টাকা।  তবে এ সকল বিষয়ের শিক্ষকদের দাবি তাদের বিষয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়।  তাই কেন্দ্র কলেজে পরীক্ষার্থী প্রতি বিনারশিদে একটা খরচ দিতে হয়।  এ খরচ যোগাতে তারা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন।  

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের একাধিক পরীক্ষার্থী জানান, অন্য বিষয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে হবে তাই কেন্দ্র ফি’র অজুহাতে ব্যবহারিক পরীক্ষায় টাকা নেন বহিরাগত শিক্ষককে ম্যানেজ করতে।  কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষাতো নিজ কলেজের শিক্ষকই গ্রহণ করে নম্বর দিবেন।  সেখানেও তিনশত টাকা গুনতে হচ্ছে। 

সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক লিমন মিয়া জানান, তার এক পরীক্ষার্থীর তিন বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে এক হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।  এ ঘুষের টাকা যোগাতে তাকে আড়াই মণ ধান বিক্রি করতে হয়।  টাকা না দিলে বা প্রতিবাদ করলে ফেল করে দেয়ার হুমকি দেয়ায় বাধ্য হয়ে টাকা দিচ্ছেন সবাই।  তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা নিজ কলেজের শিক্ষকই গ্রহণ করবেন।  তবুও তাকে টাকা না দিলে ফেল করে দেয়ার হুমকি দেন।  তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। 

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একজন কলেজ শিক্ষক দাবি করেছেন, শুধুমাত্র লালমনিরহাট সরকারি কলেজ ব্যতিত জেলার অধিকাংশ কলেজে ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে টাকা আদায় করেছেন শিক্ষকরা।  এ বিষয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ, অন্যথায় মেধার মূল্যায়ন হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক জালাল উদ্দিন জানান, একটা পরীক্ষা চালাতে কিছু খরচ হয় তাই পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাত্র ৩০০ টাকা চাওয়া হয়েছে।  সামান্য কয়েকজন দিয়েছেন।  গরিব এলাকা সবাই টাকা দেয় না।  কলেজ অধ্যক্ষের অনুমতিতে টাকা আদায় করে তাকেই জমা দিচ্ছেন।  শুধু তিনিই নন, জেলার প্রায় সকল কলেজে আইসিটি ব্যবহারিকে টাকা নেয়া হচ্ছে।  গরিব এলাকা বলে তিনি ৩০০ নিলেও অনেক কলেজে ৫০০ টাকাও আদায় করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।  

সাপ্টিবাড়ি ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ সুদান চন্দ্র জানান, গরিব এলাকা হিসেবে তার কলেজের অধিকাংশ পরীক্ষার্থী পরীক্ষার ফিস দেয় না।  সেখানে ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য টাকা দেয়া তো ভাবাই যায় না।  কেন্দ্রের কিছু খরচের জন্য চাপ দিয়ে নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা হয়তো কৌশলে কিছু  আদায় করে ম্যানেজ করেন।  বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও এ প্রতিবেদককে সংবাদ না করতে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার জোরচেষ্টাও করেন তিনি। 

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) জহুরুল ইসলাম জানান, পরীক্ষা কেন্দ্রের খরচ ফরম পুরনের সময় নেয়া হয়।  সেই অনুযায়ী শিক্ষাবোর্ড কেন্দ্রের খরচ নির্বাহ করেন।  ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য কোনো টাকা গ্রহণ করা যাবে না।  কেউ এমন করে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।