১:৫৮ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার | | ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




সাহিত্য বিশারদ কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি অযত্নে অবহেলায়

২০ মে ২০১৯, ১১:৩৮ এএম | জাহিদ


আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট : ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক/কে বলে তা বহুদূর/ মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক/ মানুষেতে সুরাসুর’ 

কবি শেখ ফজলল করিমের এ কবিতাটি ছোট বেলায় পড়েননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।  কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় হারাতে বসেছে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি পাঠাগারটি।  দখল হয়ে যাচ্ছে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারের জমি। 

প্রতি বছর কবি শেখ ফজলল করিমের মৃত্যু ও জন্ম বার্ষিকী নীরবেই কেটে যায়।  কবির স্থানীয় ভক্তরা জানিয়েছেন, প্রতিবছর কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে হয় না মিলাদ মাহফিল, এমনকি কোন আয়োজন।  লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি বিজড়িত গ্রামের বাড়িতে পারিবারিকভাবে ছোট পরিসরে দোয়া আর মিলাদ মাহফিলের মাঝে সীমাবদ্ধ কবির মৃত্যুবার্ষিকী। 

জানা গেছে, ২০০৫ সালে কবির স্মৃতি রক্ষার্থে কবির বাড়ির অদূরে কাকিনা বাজারে নির্মিত পাঠাগারটিতে নেই কোন কেয়ারটেকার, নেই পাঠক, রয়েছে বইয়ের সংকট।  বর্তমানে পাঠাগারটির সামনে সিএনজি ও অটোচালিত রিক্সার গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।  এ যেন সম্মানের নামে অপমান।  কবির নামে এটা প্রহসন বলেও মন্তব্য করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কবি ভক্তরা। 

কবির পারিবারিক সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলা, মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক নেতা, কবি, লেখক অনেকেই কবির বাড়ি পরিদর্শনে এসে বিভিন্ন রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন।  যা কখনই বাস্তবায়ন হয়নি।  শুধুমাত্র কবির বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটি পাকা হওয়া এবং কবির নামে কাকিনা বাজারে একটি দ্বিতল ভবনের পাঠাগার নির্মিত হলেও কবির বাড়ি ও ব্যবহারিক সংগ্রহশালা এখন ধ্বংসের পথে। 

সরকারিভাবে কখনই পালিত হয় না কবির জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী।  পারিবারিকভাবে সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব স্মরণ করা হয় কবিকে।  কবির স্মৃতিগুলো রক্ষার্থে বাড়িটি মেরামত করে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণ, পাঠাগারটিতে একজন লাইব্রেরিয়ানসহ পর্যাপ্ত বইয়ের ব্যবস্থা করা এবং কবির জীবনী ও তাঁর বিভিন্ন বই সংরক্ষণ করে জেলা শহরে কবির নামে একটি পাঠাগার স্থাপন করার দাবি জানান বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। 

২০০৫ সালে নির্মিত পাঠাগার টিতে ২০০৯ সালে দেখভালের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে স্থানীয় আজিমুদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে এক  হাজার টাকায় সম্মানিততে নিয়োগ দেওয়া হয়।  কিন্তু বাস্তবে একটি টাকাও সম্মানি পাননি। 

কাকিনা উত্তর বাংলা ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান, আসাদুজ্জামান, লাবনী রানী সরকার, কৃষ্ণনা রায় ও শিরিন।  তারা জানান, কবির স্মৃতি পাঠাগারের সামনে বর্তমানে সিএনজি ও অটোচালিত রিক্সার গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।  সামনে থেকে বোঝার উপয় নেই এখানে একটি পাঠাগার রয়েছে।  সম্মানের নামে কবিকে অপমান করা হচ্ছে।  

১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন শেখ ফজলুল করিম।  মাত্র ১৩ বছর বয়সে পার্শ্ববর্তী বিনবিনা গ্রামের গনি মোহাম্মদ সর্দারের মেয়ে বসিরন নেছা খাতুনের সাথে বিয়ে হয় কবির। 

কাকিনার মত অজপাঁড়া গায়ে নিজ বাড়িতে শাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস নামের ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।  জীবদ্দশায় সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন কবি।  তিনি মোট ৫৫টি গ্রন্থ লিখে ছিলেন।  সংরক্ষণের অভাবে যার অনেক গুলোর এখন আর হদিস মিলে না। 

সাহিত্য চর্চার সুবিধার্থে সবার জন্য উম্মুক্ত কবি বাড়িতে ১৯৯৬ সালে করিমস্ আহামদিয়া লাইব্রেরী নামের একটি পাঠাগার স্থাপন করেছিলেন।  যার কোন চিহ্নই আজ আর অবশিষ্ট নেই। 

বাংলা ১৩২৩ (১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ) সনে ভারতের নদীয়া সাহিত্য পরিষদ তাকে সাহিত্য বিশারদ উপাধিতে ভূষিত করেন।  কিন্তু ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কবি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পর অরক্ষিত হয়ে পড়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি। 

উত্তর বাংলা কলেজের প্রভাষক সুভাস চন্দ্র বলেন, ‘সঠিক পরিচালনার অভাবে কবির পাঠাগারটির আজ এমন অবস্থা।  পাঠারগারটি পরিচালনা করার জন্য সঠিক লোক থাকলে বা সব সময় খোলা থাকলে শিক্ষার্থীরা কিছু জানবে কিছু শিখবে। ’

কবির বাড়ির ভিতরে একটি কক্ষে কবির ব্যবহৃত টুপি, দোয়াত-কলম, ছোট্ট কোরআন শরিফ, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ও কিছু বোতাম সংরক্ষণ করে রেখেছেন কবির প্রপুত্র (নাতি) ওয়াহিদুন্নবী।  তিনিও বয়সের ভারে নাজুক হয়ে পড়েছেন।  তিনি বলেন, 'কবির স্মৃতি ধরে রাখতে যত্ন করছি কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সংস্কার করতে পারছি না।  দীর্ঘদিন এমনি পড়ে থাকায় কবির ব্যবহৃত জিনিসগুলো নষ্ট হতে চলেছে। ’

ওয়াহিদুন্নবী আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘সরকার যায় আর আসে কিন্তু কবির দিকে কেউ থাকায় না।  আমার কানে আসে অনেক বরাদ্দ আসে কবির নামে কিন্তু এসব কোথায় যায় তার কোন খবর নেই। ’

‘পাঠাগারটিতে প্রচুর পরিমানের বই রাখা উচিৎ কিন্তু সেখানে এখন সিএনজি ও অটোচালিত রিক্সার গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে কাকিনায় কবির স্মৃতির উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটি স্মৃতিফলক রয়েছে যা কবির বাড়ির দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।  এ ছাড়া আর কোন উল্লেযোগ্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। 

বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হলে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি চিহ্নগুলো সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি কবির বাড়িটি দেশের উল্লেখযোগ্য স্থানে পরিণত হবে।