৪:১৬ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১২ রবিউস সানি ১৪৪১




লালমনিরহাটে লো-ভোল্টেজে চা কারখানা বন্ধ, সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা লোপাট

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:০৩ এএম | নকিব


আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ লালমনিরহাট জেলার জমি চা চাষের জন্য বেশ উপযোগী।  তাই এখানে প্রতিনিয়ত চা চাষীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। 

বর্তমানে এ জেলায় ৬৭ জন চা চাষী প্রায় ৩৪ হেক্টর জমিতে চা চাষাবাদ করছেন।  চলতি বছরে এ পর্যন্ত একশ' টন সবুজ চা পাতা উৎপন্ন হয়েছে। 

চা চাষকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালে হাতীবান্ধা উপজেলার পূর্ব বিছনদই এলাকায় 'সোমা চা প্রসেসিং লিমিটেড' নামে একটি কারখানা গড়ে উঠেছে। 

কিন্তু বিদ্যুতের লো ভোল্টেজের কথিত অজুহাতে চা প্রসেসিং কারখানাটি বন্ধ করে রাখেন ওই কারখানার পারিচালক ফেরদৌস আহম্মেদ। 

কারখানাটি বন্ধ থাকলেও ফেরদৌস আহম্মেদ চা শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির নামে একশত ভুয়া শ্রমিকের তালিকা তৈরী করে সরকারি বরাদ্দ সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা লুটপাট করেছেন এমন অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। 

এদিকে কারখানাটি চালু না হওয়ায় জেলায় নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে না। 

লালমনিরহাট চা উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৫ উপজেলায় একশত হেক্টর জমিকে চা চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা হাতে নেয় বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ড। 

পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জেলার হাতীবান্ধায় চা উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প অফিসও গড়ে ওঠে।  ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে হাতীবান্ধায় সাতশত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী হবে। 

চা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জেলায় এ পর্যন্ত ৬৭ জন চাষীকে চা চাষের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। 

বর্তমানে জেলার ৩৪ হেক্টর জমিতে চা চাষাবাদ হচ্ছে।  প্রতিনিয়ত চা চাষী ও চা আবাদি জমির সংখ্যা বাড়ছে।  কিন্তু চাষীদের তাদের চা পাতা জেলা থেকে ২ শত কিলোমিটার দুরে গিয়ে পঞ্চগড় জেলায় চা প্রসেসিং কারখানায় বিক্রি করতে হয়। 

চাষীরা যাতে সহজে তার উৎপাদিত চা পাতা বিক্রি করতে পারে সেই লক্ষে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ডের তদারকিতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের আর্থিক সহয়তায় জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বিছনদই এলাকায় সোমা চা প্রসেসিং লিমিটেড নামে একটি চা কারখানা গড়ে ওঠে। 

কিন্তু বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কথিত অজুহাতে ওই কারখানাটি আজও চালু করেননি মালিকপক্ষ।  ফলে চাষীরা তাদের জমির চা পাতা চা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অনেক কষ্টে পঞ্চগড় জেলায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছে। 

এতে অনেক সময় চা পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  ফলে অনেকেই এই ঝামেলার কারনে চা চাষাবাদে এগিয়ে আসছে না।  এতে জেলায় নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে না। 

চা বোর্ড সাতশত মানুষের যে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নিয়েছে তা ভেঙ্গে পড়ছে। 

বেশ কিছুদিন ধরে সোমা চা প্রসেসিং কারখানাটি বন্ধ করে রাখেন ওই কারখানার পরিচালক ফেরদৌস আহম্মেদ। 

সরকার যখন চা শ্রমিকদের সরকারিভাবে প্রতি বছর অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখনি নড়েচড়ে বসেন তিনি।  এক একর চা আবাদী জমিতে ৩জন করে চা শ্রমিক থাকার নিয়ম রয়েছে।  সেই অনুয়ায়ী তার সোমা চা বাগানে ৪ একর জমিতে ১২জন শ্রমিক কর্মরত থাকার কথা।  কিন্তু তিনি কাগজ কলমে ভুয়া একশত জন চা শ্রমিক কর্মরত দেখিয়ে ২ বছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা লুপপাট করেন।  জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় ৫টি চা বাগান থাকলেও ওই তালিকায় শুধু স্থান পেয়েছে সোমা চা বাগানের শ্রমিকরা।  ফলে যারা এ অনুদান পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই চা শ্রমিক নন। 

হাতীবান্ধা সমাজ সেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরে ৫১জন চা শ্রমিকের মাঝে জনপ্রতি ৫ হাজার করে ২ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা এবং চলতি বছরে একশত শ্রমিকের মাঝে জনপ্রতি ৫ হাজার করে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান হিসেবে বিতরণ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।  ওই সুবিধাভোগী চা-শ্রমিক তালিকার সবাই ফেরদৌস আহম্মেদের 'সোমা চা বাগানে' কর্মরত। 

হাতীবান্ধা উপজেলায় আরো ৪টি চা বাগান থাকলেও তাদের শ্রমিক ওই সুবিধা ভোগীদের তালিকায় স্থান পায়নি। 


সোমা চা বাগানের পরিচালক ফেরদৌস আহম্মেদ বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে এ অঞ্চলের চা চাষাবাদ শুরু করেছি।  বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে আমার কারখানাটি চালু করতে পারছি না।  তাই ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের কথা ভেবে কিছু সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করেছি।  তবে অনুদান বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। 


হাতীবান্ধা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, আমি যেভাবে পত্র পেয়েছি সেই পত্রের আলোকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।  হাতীবান্ধায় ৫টি চা বাগান কিন্তু অনুদান পেলো একটি বাগানের কথিত একশত শ্রমিক এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেননি ওই সমাজসেবা কর্মকর্তা। 


বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ডের লালমনিরহাট অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক আরিফ খান বলেন, আমি চা উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক হলেও হাতীবান্ধায় চা শ্রমিকদের সরকারি অনুদান দেয়া হয়েছে এমন তথ্য আমার কাছে নেই।  ৪ একর জমি নিয়ে সোমা চা বাগান।  সেই ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মে ওই চা বাগানে ১২জন শ্রমিক কর্মরত থাকবে এবং ওই ১২জন সরকারী সুবিধা পাবেন।  তারা একশত শ্রমিক কোথায় পেলেন তা আমি বলতে পারছি না।  বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের যে কথা বলা হচ্ছে সেটা একটা অজুহাত মাত্র।  একটি ভোল্টেজ যন্ত্রের মাধ্যমে কারখানাটি চালু করা সম্ভব। 


হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল আমিন জানান, অল্প সময়ের মধ্যে অনুদান বিতরণ করা হয়েছে বিধায় বিষয়টি সেভাবে দেখভাল করা সম্ভব হয়নি।  তারপরও অনিয়ম হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। 




আজিজুল ইসলাম বারী,০১৭১৭-৯৯৭৭৯৫।