১০:৪২ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২২, বুধবার | | ১৯ মুহররম ১৪৪৪




ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মদিন আজ

২২ মার্চ ২০২২, ১২:৩৯ পিএম |


এসএনএন২৪.কম : ১৮৯৪ সালের আজকের এই দিনে (২২শে মার্চ) চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়াতে জন্মগ্রহন করেন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ও সশস্ত্র বিপ্লবের পুরোধা মাস্টারদা সূর্যসেন।  জন্মের পর তার পারিবারিক নাম ছিলো সূর্যকুমার সেন। 

অনার্স পড়াশোনা করা অবস্থাতেই বিপ্লবী মানসিকতায় আকৃষ্ট হন তিনি।  পড়াশোনা শেষ করে বাবার মতই শিক্ষকতায় যোগ দেন।  কিন্তু তখন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে সবখানে।  তিনিও বিপ্লবে যোগ দিলেন।  যোগ করলেন সেই সশস্ত্র বিপ্লবের নতুন মাত্রা।  ব্রিটিশদের ক্ষমতার গদিতে আতংক ছড়িয়ে দেওয়া এই বিপ্লবীকে পুরো ভারতবর্ষে মাষ্টারদা সূর্যসেন নামে নতুন করে চিনতে থাকে। 

১৯৩০ সালে সূর্য সেনের দল পরিকল্পনা করলো চট্টগ্রামকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন করা হবে।  চট্টগ্রামের সাথে বাকি ব্রিটিশ রাজ্যের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়া হবে।  ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলা হবে, টেলিফোন-টেলিগ্রাফ লাইন ধ্বংস করে ফেলা হবে, ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুট করে তাদের অস্ত্রে তাদেরকেই ঘায়েল করতে হবে।  সফলও হয়েছিলেন তিনি।  পুরা তিন দিন-রাত চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রেখেছিলেন তিনি।  তার বিপ্লবী বাহিনী তাকে প্যারেড করে রাষ্ট্রীয় সম্মানও জানিয়েছিলেন।  অফিস আদালত থেকে ব্রিটিশদের নাম মুছে দেওয়া হলো।  ব্রিটিশদের কর দেওয়া বন্ধ করা হলো।  এই অল্পসময়ে ব্রিটিশদের শাসনের পরিবর্তে চট্টগ্রামে নতুন একটা শাসন ব্যবস্থা চালু করলেন।  এই আঘাতটা ছিলো ভারতবর্ষের মধ্যে ব্রিটিশদের উপর সবচেয়ে বড় আঘাত।  কিন্তু তিনদিন পরে ব্রিটিশদের পুন: আক্রমনে ঠিকতে পারেননি তিনি ও তার বাহিনী অস্ত্রের অভাবে।  সূর্য সেন তখনো গা ঢাকা দিয়েছিলেন।  এ সময়ের মধ্যেই মাষ্টারদা সূর্যসেনের বীরত্বের কথা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো পুরো ভারতবর্ষে।  দলে দলে তরুনরা এমনকি নারীরাও ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠনগুলোতে নাম লেখাতে শুরু করে।  পুরো ভারতবর্ষ তখন স্বাধীনতা ফিরে আসবে এই বিশ্বাসে উজ্জিবিত হলো। 

এদিকে আত্মগোপনে থাকা মাষ্টারদা সূর্য সেনের মাথার ওপরে বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিলো ব্রিটিশরা। আত্মগোপনে থেকে ব্রিটিশদের গদিতে খন্ড খন্ড আগুন দেয়া শুরু করলেন তিনি ও তার বাহিনী।  তারা ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশদের সরকারী অফিস পুড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি ব্রিটিশ কর্মকর্তা বা নাগরিকদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকেন। 

১৫ জনের একটি বাহিনী নিয়ে এমন অভিযানে গিয়ে নারী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যু হয়।  তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি মহিলা স্বাধীনতা যোদ্ধা যিনি সূর্য সেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন।  পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের অভিযানে নিজের বাহিনী নিয়ে যাওয়ার পর নিশ্চিত আটক হচ্ছেন বুঝতে পেরে তিনি আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। 

পরবর্তীতে আত্মগোপনে তিন বছর থাকাকালীন সময়ে ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের সহযোগী নেত্র সেনের বাড়িতে তারই বিশ্বাসঘাতকতায় ব্রিটিশদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন।  সূর্যসেনের মাথার ওপরে পুরস্কার ছিলো, সেই লোভেই নেত্র সেন এই কাজ করেছিলো বলে জানতে পেরে পুরস্কার পাওয়ার আগেই সূর্যসেনের সহযোগিরা এই বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করে।  গ্রেফতারের পর সূর্য সেনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিলো।  কিন্তু তার আগে ব্রিটিশরা সূর্যসেনের সবগুলো দাঁত হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলে, তার নখগুলো প্লায়ার্স দিয়ে টেনে তুলে ফেলে।  বলা হয় যে, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে নিয়ে যাওয়ার সময় তার জ্ঞান ছিলো না।  চট্টগ্রাম কারগারে তার ফাঁসি দেয়া হয়েছিলো ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি।  এরপর ব্রিটিশদেরকে ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো তার ১৩ বছর পর। 

আজো বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাতে স্মরন করে মাষ্টারদা সূর্যসেনকে।  কলকাতায় একটা মেট্রো রেল স্টেশন আছে তার নামে।  কলকাতা হাইকোর্টের সামনে তার একটা আপাদমস্তক মূর্তি আছে।  এই পর্যন্ত দুইটি সিনেমা তৈরী করেছে ভারতীয়রা।  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের ছাত্রাবাসের নাম করা হয়েছে তার নামে।  সূর্যসেনের জন্মস্থান চট্টগ্রামে রাউজানের ভিটেবাড়ি দেখতে এসেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখার্জি।  বিপ্লবী সূর্যসেন আজ আর নেই।  তবু বাংলা ও ভারত তথা এই উপমহাদেশের কোটি কোটি তরুন-যুবক যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে মাষ্টার দা সূর্য সেনকে স্মরণ করে, রক্তে আগুন লাগাতে তার নামে স্লোগান ধরেন। 


keya