১০:২১ এএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার | | ২৯ সফর ১৪৪৪




খুনিদের আশ্রয়দাতা দেশগুলোই মানবতার ছবক শেখায়: প্রধানমন্ত্রী

১৬ আগস্ট ২০২২, ১০:৩৯ পিএম |


এসএনএন২৪ ডেস্ক:

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয়দানকারী দেশগুলোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার বাবা-মা ও ভাইদের যারা হত্যা করেছে সেই খুনিদের আশ্রয় দেওয়া বড় দেশগুলো আজ মানবাধিকারের কথা বলে।  মানবতার ছবক শেখায়। 

মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যেসব দেশ মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে আমাদের নিষেধাজ্ঞা দেয়, তারা তো খুনিদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।  খুনি রাশেদ ছিল মিলিটারি অর্ডারে যে অপারেশন হয়, তার কমান্ডিং অফিসার।  রাশেদও শাহরিয়ারের নেতৃত্বে ওখানে যায়.. এবং মাজেদ।  মাজেদকে আমরা আনতে পেরেছি।  কিন্তু রাশেদকে আনার জন্য বারবার আমেরিকার সঙ্গে কথা বলেছি।  কিন্তু তারা দিচ্ছে না।  তাকে তারা লালন-পালন করে রেখে দিচ্ছে।  আর নূর আছে কানাডায়।  অথচ এইসব দেশের কাছে আমাদের মানবতার ছবক নিতে হয়।  আমার পরিবারের হত্যাকারীদের আশ্রয়দাতারা আমাদের মানবাধিকার শেখাতে চায়। 

তিনি বলেন, খুনি রশিদ লিবিয়াতে পড়ে থাকে।  মাঝে মাঝে পাকিস্তানে যায়।  ডালিমের খোঁজ…পাকিস্তানের লাহোরে আছে এইটুকু জানি, এর বেশি জানি না।  মোসলেম উদ্দিন ভারতের আসামের কোনো অঞ্চলে ছিল, বহু চেষ্টা করেছি, তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।  নামটাম পাল্টে রয়ে গেছে।  তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছি।  এ কয়জনকে এখনো আনতে পারিনি। 

শেখ হাসিনা বলেন, আমার প্রশ্ন, আমাদের মানবাধিকার কোথায়? কার কাছে বিচার চাইবো? যারা খুনিদের লালন-পালন করলো, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, খুনি বা কেউ কেউ সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা, তাদের কাছে? বিএনপি তো এদের মদতদাতা, লালন-পালনকারী। 

সরকারপ্রধান আরও বলেন, আমাদের সরকারকে মানবাধিকারের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়।  যারা এ প্রশ্ন করে তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, ১৫ আগস্টে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তখন তাদের মানবাধিকার কোথায় ছিল? আমাদের তো তখন বিচার চাওয়ার অধিকারও ছিল না।  আমরা বাবা-মা হারিয়েছি।  আমরা মামলা করতে পারবো না।  বিচার চাইতে পারব না।  কেন? আমরা দেশের নাগরিক না? আমি, আমার ছোট বোন বিদেশে ছিলাম।  বেঁচে গিয়েছিলাম ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাত থেকে।  এই বাঁচা যে কত যন্ত্রণার, যারা বাঁচে তারা জানে। 

তিনি বলেন, আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছিলো।  ১৯৯৬ সালে যদি সরকারে আসতে না পারতাম, যদি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করতে না পারতাম, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার কোনোদিন হতো না।  বারবার বাধা এসেছে।  এমনকি বক্তৃতা দিয়ে বিচার চাইতে গিয়েও বাধা পেয়েছি।  বলা হয়েছে, জাতির পিতার হত্যার বিচার চেয়ে বক্তৃক্তা দিলে নাকি কোনোদিন ক্ষমতায় যেতে পারব না।  এ রকম কথাও আমাকে শুনতে হয়েছে।  আমি বাধা মানিনি।  আমি দাবিতে সোচ্চার হয়েছি।  দেশে-বিদেশে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। 

সরকারপ্রধান আরও বলেন, সর্বপ্রথম এই হত্যার প্রতিবাদ করে বক্তব্য দিয়েছে রেহানাৎ, ১৯৭৯ সালে সুইডেনে।  এরপর আমি ১৯৮০ সালে বিদেশে গিয়েছি।  একটা কমিশন গঠন করেছি, চেষ্টা করেছি আন্তর্জাতিকভাবে।  তখন তো দেশে আসতে পারিনি, আমাকে আসতে দেওয়া হবে না।  ১৯৮১ সালে দেশে আসার পর জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি।  মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়েছিল আমার বাবা-মা-ভাইয়ের নামে।  কোথায় সেগুলো? কত রকমের মিথ্যা অপপ্রচার দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।  তারপরও ঘাতকচক্র দেখলো যে, না- বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে জাতির পিতার নাম মুছে ফেলা যায় না। 

তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে লাশগুলো তো পড়ে ছিল।  কত স্লোগান, বঙ্গবন্ধু তুমি আছো যেখানে, আমরা সেখানে।  অনেক স্লোগানই তো ছিল।  কোথায় ছিল সেই মানুষগুলো? একটি মানুষও ছিল না সাহস করে এগিয়ে আসার? একটি মানুষও ছিল না প্রতিবাদ করার? কেন করতে পারেনি? এত বড় সংগঠন, এত সমর্থক, এত লোক।  কেউ তো একটা কথাও বলার সাহস পায়নি।  ১৫ আগস্ট থেকে ১৬ আগস্ট ওই লাশগুলো পড়ে ছিল।  ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেল টুঙ্গিপাড়ায়।  কারণ, দুর্গম পথ।  ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে, কেউ যেতে পারবে না।  তাই সেখানে নিয়ে মা-বাবার কবরের পাশে মাটি দিয়ে আসা হয়।  সেখানকার মৌলভী সাহেব আপত্তি করে বলেছিলেন- গোসল দেব, কাফন-দাফন…। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু নিয়ে যাননি (বঙ্গবন্ধু), শুধু দিয়ে গেছেন।  একটা দেশ দিয়ে গেছেন; একটা জাতি দিয়ে গেছেন; পরিচয় দিয়ে গেছেন; আত্মপরিচয় দিয়ে গেছেন।  কিছুই নিয়ে যাননি বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে।  বাংলাদেশের গরিব মানুষকে যে রিলিফের কাপড় তিনি দিতে পারতেন সেই রিলিফের কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে সে কাপড় দিয়ে তাকে কাফন দেওয়া হয়েছিল।  আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে কিছুই নিয়ে যায়নি।  ওই ১৬ আগস্টে সব লাশ নিয়ে বনানীতে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। 

তিনি বলেন, মুসলমান হিসেবে যে দাবি থাকে জানাজা পড়ার সেটাও তো পড়েনি।  একটু কাফনের কাপড়, সেটাও দেয়নি।  পঁচাত্তরের ঘাতকরা সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছিল।  কিন্তু ইসলামিক কোনো বিধি তারা মানেনি।  আমার একটা প্রশ্ন, আমাদের নেতারাও তো এখানে আছেন।  জাতির পিতা তো অনেককে ফোনও করেছিলেন।  কী করেছিলেন তারা? বেঁচে থাকতে সবাই থাকে।  মরে গেলে যে কেউ থাকে না তার জীবন্ত প্রমাণ এটা।  এজন্য আমি কিছু আশা করি না।  সব সহ্য করে সেদিন নীলকণ্ঠ হয়ে শুধু অপেক্ষা করেছিলাম, কবে ক্ষমতায় যেতে পারবো আর এদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।  দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবো।  তাহলেই এ হত্যার প্রকৃত প্রতিশোধ হবে। 

শেখ হাসিনা বলেন, বিচারের বাণী তো নিভৃতে কাঁদে।  আমি ফিরে এসেও তো বিচার করতে পারিনি।  আমি ১৯৮১ সালে দেশে এসেছি, ৯৬-এ ক্ষমতায় গিয়েছি।  এসময় কতবার ওই হাইকোর্টে গিয়েছি, বক্তৃতা দিয়েছি।  বিচারিক আদালতে গিয়েছি।  আমাদের তো মামলা করারও অধিকার ছিল না।  কারণ, ইনডেমনিটি দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। 

সরকারপ্রধান বলেন, তৎকালীন জজ সাহেব গোলাম রসূল সাহসী ছিলেন।  কোর্টে গিয়েছিলেন এবং বিচারের রায় দিয়ে খুনিদের ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন।  খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালে সব বিচারকার্য বন্ধ করে দেন।  এরপর আমরা যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এলাম তখন এ হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ আবার শুরু করি।  হাইকোর্টে আমরা আপিল করি।  বিচারকদের তালিকায় লেখা আওয়ামী লীগের পক্ষের লোক।  কোর্টে গেলে তারা বিব্রতবোধ করেন।  মানে এই বিচারের রায় তারা দিতে পারবেন না।  প্রধান বিচারপতি ছিলেন তোফাজ্জল সাহেব।  আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।  তার রায়ে এই খুনিদের ফাঁসি হয়, যেটা আমরা কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছি। 

দুর্নীতির অপবাদ দেওয়ার পরও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ, আমার কোনো শক্তি নেই, অর্থ-সম্পদ নেই।  তবে আমার শক্তি আছে, সেটা জনতার শক্তি।  সেই শক্তি ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি।  প্রমাণ করেছি নিজের ভাগ্য গড়তে আসিনি; দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে এসেছি। 

করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমেরিকা-রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার কারণে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে, প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে গেছে।  আমাদের আমদানির প্রতিটি পণ্যের মূল্য বেড়েছে। 

সংকটের কারণে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশেই বিদ্যুতের রেশনিং করা হচ্ছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে পরিস্থিতিতে আমরা বাধ্য হয়েছি তেলের দাম বাড়াতে।  কারণ, তেলের দাম সবসময় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হয়।  আমাদের টাকা যখন শক্তিশালী ছিল… ডলারের দাম বিশ্বব্যাপী বাড়াতে আমরাও বাধ্য হয়েছি টাকার মান সামঞ্জস্য করতে।  তেলের দামও বিশ্বব্যাপী বেড়ে গেছে।  আমরা কত টাকা আর ভর্তুকি দেবো?

তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় দেশের মানুষের কষ্ট হচ্ছে।  এটা উপলব্ধি করতে পারি।  এটা বুঝি।  যে কারণে আমরা সিদ্ধান্ত দিয়েছি ৫০ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজিতে চাল সরবরাহ করবো।  ১ কোটি পারিবারিক কার্ড দেবো, যেন সাশ্রয়ী দামে ডাল, তেল, চিনি কিনতে পারে। 

সভা সঞ্চালন করেন দলটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।  এতে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান ও কামরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ। 


keya