৬:৪২ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার | | ৯ রমজান ১৪৪৭




টানেলের পর গলার কাঁটা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

০৩ মার্চ ২০২৫, ১০:৩০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


ডেস্ক রিপোর্ট : 


কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের পর এখন গলার কাঁটা চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।  এ দুটি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি।  দুটিতে যানবাহন চলছে সমীক্ষার চেয়ে অন্তত ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কম।  অথচ দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় করা হয় ১৬ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।  এর মধ্যে টানেল নির্মাণে ব্যয় হয় ১১ হাজার কোটি টাকা।  এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হয় ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।  


অভিযোগ রয়েছে, ফরমায়েশি সমীক্ষায় দুই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।  অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।  টানেলের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।  


সবশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বাড়ি যেতে টানেল নির্মাণ হয়েছে।  একজন মন্ত্রীর বাড়ি যেতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশের পর ক্ষোভ আরও বেড়েছে।  টানেল নিয়ে নতুন করে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। 


২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর চালু হয় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত আলোচিত টানেল।  চালুর পর থেকে প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল বাড়েনি।  দৈনিক গড়ে যানবাহন চলাচল করেছে সাড়ে চার হাজারের কম।  এ হিসাবে চলাচলের সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ শতাংশ কম।  সমীক্ষা রিপোর্টে চালুর পর বর্তমান সময়ে যা চলাচল করার কথা তার এক-তৃতীয়াংশও করছে না।  চালুর পর দেড় বছর পার হতে চললেও ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।  কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা কল্পকাহিনি হয়েই আছে।  


টানেলের সামগ্রিক ব্যয়ের মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকার চীনা ঋণ ২ শতাংশ সুদসহ আগামী ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে।  চলতি বছর থেকে টানেলের আয় দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ শুরু করার কথা।  টানেলের নির্মাণ ব্যয় তুলে আনাসহ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মূলত আদায় করা টোল থেকে নির্বাহ হবে।  প্রত্যাশা-প্রাপ্তিতে বড় ঘাটতির কারণে সেটি অনিশ্চিত হয়েই থেকেছে। 


সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু টানেল নিয়ে যে সম্ভাব্যতা জরিপ হয় তাতে উল্লেখ ছিল বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারে।  সমীক্ষার হিসাবে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করার কথা ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি।  চালুর পর দেড় বছর পার হতে চললেও এখনও দৈনিক গাড়ি চলাচল সাড়ে চার হাজার অতিক্রম করতে পারেনি।  গত ফেব্রুয়ারি মাসে টানেল হয়ে গাড়ি চলেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০।  দৈনিক গড় হিসাবে ৪ হাজার ২০০ গাড়ি চলেছে।  প্রতিদিন ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের বিপরীতে এখনও গড় আয় ১০ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। 


এ ব্যাপারে টানেলের ব্যবস্থাপক (টোল) বেলায়েত হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, গাড়ি চলাচল এখনও দৈনিক ১৭ হাজারে পৌঁছতে পারেনি।  গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ গাড়ি চলেছে।  প্রতিদিন গড় হিসাব করলে ওই মাসে ৪ হাজার ২০০টি করে গাড়ি চলেছে। 


তিনি বলেন, গাড়ি চলাচল কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে।  সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে গাড়ি চলাচল বেড়েছে।  কিন্তু প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।  একই অবস্থা গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে চালু হওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রে।  চলতি ২০২৫ সালে দৈনিক অন্তত ৭০ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।  গত ৩ জানুয়ারি চালুর পর দেখা যায় গাড়ি চলছে দৈনিক সাড়ে ছয় হাজার থেকে পৌনে সাত হাজার।  এখনও দৈনিক গাড়ি চলাচল সংখ্যা সাত হাজার অতিক্রম করেনি।  অথচ এটির সম্ভাব্য সমীক্ষায় বলা হয়েছিল ২০২৫ সালে গাড়ি চলবে ৬৬ থেকে ৭০ হাজার। 


চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্ট অ্যান্ড কনসালটেশনের করা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রতিদিন গাড়ি চলাচলের এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। 


এ ব্যাপারে সিডিএর প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ের অনেক র‌্যাম্প (যানবাহন ওঠানামার পথ) চালু বাকি আছে।  এসব র‌্যাম্প চালু হলে গাড়ি চলাচল বাড়বে।  অন্যথায় গাড়ি চলাচল প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।  র‌্যাম্প হলে বর্তমানে যে পরিমাণ গাড়ি চলছে তা আরও অনেক বেশি চলত।  অনেকে টোল বাঁচানোর জন্য এক্সপ্রেসওয়ে এড়িয়ে চলছে। 


এড়িয়ে যাওয়া যানবাহন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলাচলে বাধ্য করা যায় কি না-এ প্রশ্নে তিনি বলেন, মাত্র ৮০/১০০ টাকা টোল বাঁচাতে নিচের সড়ক দিয়ে চলছে যানবাহন।  চালক বা গাড়ির মালিক মনে করছেন এক্সপ্রেসওয়ের নিচে চলাচল করলে টোল দিতে হচ্ছে না।  অথচ নিচে চলাচল করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।  তাতে তেলের বা গ্যাসের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।  আবার এক্সপ্রেসওয়ে এড়িয়ে নিচের সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করায় যানজট কমছে না।  মানুষ এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। 


সিডিএ সূত্র জানায়, বছরে অন্তত ১০০ কোটি টাকা আয়ের টার্গেট ছিল এক্সপ্রেসওয়ের টোলবাবদ।  সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৮ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩৩ লাখ টাকা আয় হওয়ার কথা।  কিন্তু চালুর পর দেখা গেছে প্রত্যাশার চেয়ে বাস্তবতার মিল নেই।  গত জানুয়ারিতে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।  ফেব্রæয়ারি মাসেও টোল আদায় হার দেড় কোটি টাকায় পৌঁছেনি। 


পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী শুভাষ বড়–য়া  বলেন, টানেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের আগে সমীক্ষা করা হয়েছে।  তবে সমীক্ষাগুলো যথাযথ ছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।  সমীক্ষা ছিল অনেকটা ফরমায়েশি সমীক্ষা।  কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করার মতো।  সঠিকভাবে সমীক্ষা হলে টানেলের বর্তমান অবস্থা উঠে আসত।  এরপর হয়তো হাজার কোটি টাকার মহা কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হতো না।  কিন্তু টানেল বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতেই হবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমীক্ষা হওয়ায় যা হওয়ার তাই হয়েছে।  টানেল এবং এক্সপ্রেসওয়ে কোথাও প্রত্যাশা অনুযায়ী গাড়ি চলছে না। 


keya