৮:১৭ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার |
| ৯ রমজান ১৪৪৭

প্রতিনিধি(রাউজান)
চট্টগ্রামের রাউজানে একের পর এক ঘটছে হত্যাকাণ্ড। এসব মামলায় নিরিহ লোকজনকে আসামী করে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। আলোচিত তিনটি হত্যা মামলায় ৫জন নিরীহকে ফাঁসানোর বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে এলাকায়। এতে একদিকে মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত আসামীরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মামলা থেকে আসামীদের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলেও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে পুলিশের নিরব ভূমিকায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মামলা অগ্রগতি। হত্যা মামলার আসামীদের ধরার জন্য পুলিশ ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করাকে আসামীদের রক্ষা করার কৌশল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, রাউজানে আলোচিত ব্যবসায়ী মানিক আবদুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর গত ১৯ এপ্রিল নিহতের স্ত্রী ছেমন আরা বেগম বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেখানে উল্লেখিত ০৫ নম্বর আসামী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের ৩নম্বর ওয়ার্ডের ছকিনা বাপের বাড়ির রফিকুল ইসলাম তালুকদারের পুত্র ইসমাইল হোসেন (৫০)কে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র আহবায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার। ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ অভিযোগ করেন। এছাড়া মানিক হত্যা মামলায় ৯ নম্বর আসামী করা হয় একই উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের পশ্চিম বেতাগী গ্রামের প্রয়াত মো. কামালের পুত্র মো. জামাল (৪৪)কে। এটিও মিথ্যা মামলা বলে দাবি করেছে জামালের পরিবার।
২২ এপ্রিল রাউজানের বহুল আলোচিত প্রকাশ্যে দিন-দুপুরে গুলি করে হত্যা করে মোহাম্মদ ইব্রাহিম এক যুবদল কর্মীকে। এ হত্যাকাণ্ডে পরবর্তী মামলা দায়ের করেন নিহতের মা খালেদা বেগম। সেখানে ০৮ নম্বর আসামী করা হয় ব্যবসায়ী এস.এম শহিদুল্লাহ রনি (৪০)কে। তিনি ডেভেলপার ও ইটভাটা ব্যবসায়ী। থাকেন চট্টগ্রাম শহরে। ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডো ০৮জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৪-৫জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়। রহস্যজনক বিষয় হচ্ছে ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ড শেষে দুর্বৃত্তরা যাওয়ার সময় আরও একটি হত্যাচেষ্টা হিসেবে মো. নাঈমকে গুলি করা হয়। ওই ঘটনায় নাঈমের ভাই আবদুল মান্নান বাদি হয়ে ১৮জনের উল্লেখ করে আরও ৫-৬জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে মামলা দায়ের করেন। সূত্র বলছে, ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরাই নাঈমকে গুলি করেছিল। তাহলে দুটি মামলায় আসামীর ক্ষেত্রে ভিন্নতার মাধ্যমে অদৃশ্য গায়েবী মামলা দিয়ে হয়রানির বিষয়টি স্পর্ষ্ট বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী এস.এম শহিদুল্লাহ রনি বলেন, প্রকাশ্যে দিন দুপুরে হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হলেও আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। অথচ আমি ঘটনার দিন রাউজান ছিলাম না।
আমার এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য আমি ইতোমধ্যে বাংলাদশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং আইজিপি, পুলিশ সুপারসহ রাউজান থানা বরাবর লিখিত আবেদন করেছি। তিনি আরও বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। আমার কাছে পূর্বে চাঁদা দাবি করায় আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করবো আপনারা নিরেপেক্ষ তদন্ত করুন। আমার অতীতের কোনো অপরধমূলক কর্মকাণ্ডের মামলা কোদ্দমা নেই। আমি প্রত্যেক বছর বাংলাদেশ সরকারকে ২৫ লাক্ষ ৪৬ হাজার ৩৭৫ টাকা ইনকাম ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রদান করছি। এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী নিহতের মা খালেদা বেগম বলেন, আমি আসামীকে চিনি না। আমার দেবর আবদুল হালিম আসামীদের নাম মামলায় দিয়েছেন। নিরহ মানুষকে আসামী করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এজাহারে কেউ নিরপরাধ থাকলে আমার দেবরকে বলে বাদ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের যুবদলকর্মী কমর উদ্দিন জিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ১৮ মার্চ তার স্ত্রী ডেজি আকতার বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই হত্যা মামলায় ০১ নম্বর আসামী উপজেলা বিএনপির সদস্য মহিউদ্দিন জীবনকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন মহিউদ্দিন জীবন। তিনি বলেন, ব্যানার শাটানোকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের উত্তেজনা সৃষ্টি হলে আমি সেখানে যাই। উভয় পক্ষকে নিভৃত করার চেষ্টা হিসেবে তাদের ঝগড়া না করার জন্য নিষেধ করি। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নই। যদিওবা মামলার এজাহারে আমার নির্দেশে তাকে মারধর করা হয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে। যাহা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন।
আমি নিহত কমর উদ্দিন জিতুর গায়ে হাত পর্যন্ত দিই নাই। কাউকে নির্দেশ দিয়েছি এরকম সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। আমি নির্দেশ দিও নাই। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য একটি চক্র ওই মামলায় আমাকে আসামী করা হয়েছে। আমি তাদের ঝগড়া না করার অনুরোধ করে ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। পরে ফোনে জানতে পারি কমর উদ্দিন জিতুকে কে বা কারা মারধর করেছে এবং পরে তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে একই মামলার দুই ব্যবসায়ীসহ তিনজনকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলার ১৫ নম্বর আসামী রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের ক্ষুদে ব্যবসায়ী মো. সৈয়দ (৪৫), ১৬ নম্বর আসামী ফুলের দোকানী মো. মামুন (৪৫) ও ১৩ নং আসামী মৎস্য হ্যাচারী কর্মচারী মোহাম্মদ ইব্রাহিম (৩০)। ফুলের দোকানী মো. মামুন মুঠোফোনে বলেন, বিএনপির দুপক্ষের অন্তকোন্দলের জেরে কমর উদ্দিন জিতুর হত্যাকাণ্ড শিকার হয়েছে।
ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ছিল। পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখে আসামী সনাক্ত করলে, নিরহ মানুষ গুলো হয়রানী থেকে মুক্তি পাবে। এখানে আমাকে আসামী কেন করা হয়েছে আমি জানি না। আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকান বন্ধ করে পালিয়ে বেড়াছি। আমার পরিবার আর্থিক কষ্টে আছে। ক্ষুদে ব্যবসায়ী মো. সৈয়দ বলেন, আমার মত ক্ষুদে মানুষকে আসামী করে মামলাকে হালকা করা হয়েছে। প্রকৃত খুনিরা মামলা থেকে বাদ পড়েছে। আমি এ মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছি। এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী নিহত কমর উদ্দিনের স্ত্রী ডেজি আক্তার বলেন, আমি কাইকে আসামী করি নাই। পুলিশ হত্যায় জড়িতদের নাম দিয়েছে। তিনি হত্যাকাণ্ডের পর একজন আমামীকে পুলিশ আটক না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে পুলিশ বলেছে এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হযেছে।
এ প্রসঙ্গে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভূইঁয়া বলেন, মামলার বাদী এজাহারে যাদের আসামী করেছে সেটা মামলা হিসাবে নেওয়া হয়েছে। মামলা গুলোর তদন্ত স্বাপেক্ষে নিরপরাধ আসামীদের বাদ দেওয়া হবে। পুলিশ প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে আদালতের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করতে নিয়মিত অভিযান অব্যহত রেখেছে।