৬:৩৩ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার | | ৯ রমজান ১৪৪৭




ঈদ হোক পেটের সমস্যামুক্ত

২৯ মার্চ ২০২৫, ১২:৪৩ পিএম | মোহাম্মদ হেলাল


ডা. মোসাব্বির আহমেদ খান:

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করি, আমরা সংযমের চর্চার মধ্যে থাকি।  সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জনের মাধ্যমে আমাদের শরীরে পরিপাকতন্ত্রে পূর্ণশক্তি সঞ্চারের একটি অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি হয়।  যেমন- পাকস্থলি তার এসিড নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস পায়। 

আন্ত্রিক তন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন বাড়ায়।  অগ্নাশয় নিরবচ্ছিন্ন ইনসুলিন নিঃসরণ থেকে বিশ্রাম পায়। 
সুশৃঙ্খল খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সহায়তা করে।  পুষ্টিকর সুষম স্বাস্থ্যসম্মত সাহরি ও ইফতার শরীরকে রাখে সুস্থ ও সতেজ। 

রোজা মুসলিমদের জন্য হাজার বছরের পুরোনো ধর্মীয় ঐতিহ্য।  অনুশাসন আধুনিক পুষ্টিবিদ্যায় চমৎকার ব্যবস্থাকে Tune restricted eating এবং intermittent fasting ইত্যাদি নামে আত্মীকরণ করা হয়েছে।  তবে তাও পালনের সংযম চর্চা শুধু খাদ্য সীমাবদ্ধ নয় বরং চলন-বলন, চিন্তা এবং আধ্যাত্মিকতায় এর যে সর্বব্যাপী প্রভাব, সেটা অতুলনীয় । 

রোজার শেষে আসে খুশির ঈদ।  আমাদের সামাজিকতায় আয়োজনে থাকেÑ সেমাই, ফিরনি, জর্দা, পায়েস, হালুয়াসহ হরেক রকমের সুস্বাদু মিষ্টান্ন।  এ ছাড়া আরো থাকে ঘি, তেলসমৃদ্ধ পোলাও, কোরমা, গরু-খাসির রেজালা ইত্যাদি।  বিভিন্ন খাবারের লোভনীয় আয়োজন উপেক্ষা করা সত্যিই কষ্টসাধ্য।  ফলশ্রুতিতে বেশি মিষ্টি খাওয়া, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, পরিমাণে অতিরিক্ত খাওয়া, ধরা পেটে আবার খাওয়া হলে সুশৃঙ্খল একটা পরিপাকতন্ত্র চরম বিশৃঙ্খলায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

তা ছাড়া খাবারের সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে বাচন প্রক্রিয়ায় কিছুটা ছন্দপতন হয়।  দেখা দেয় নানা পেটের পীড়া, বুকে জ্বালাপোড়া, অম্বল পেটব্যথা, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া এমনকি গেস্টোডেন্টেরাইটিস কোলেসিয়াস প্যানক্রিয়েটাইটিস ইত্যাদি।  এসব কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।  ব্লাড সুগার বেড়ে (dka, honk) অজ্ঞান হওয়ার মতো জটিলতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না । 

সুস্থভাবে ঈদ উদযাপনের উপায়

১. স্বল্প পরিমাণে বারবার খান।  দিনে তিনটি প্রধান খাবার ও দুটি হালকা নাস্তা খান।  প্রধান খাবার পরিমিত হওয়া চেই। 

২. সবুজ শাকসবজি ও ফল খান।  সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে শসা, লেটুস, পালংশাক ইত্যাদি খান।  তাজা ফলমূল যেমনÑ কলা, আপেল, নাশপাতি, পেয়ারা ইত্যাদি খান।  এগুলো কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করে।  এ ছাড়াও এগুলো আমাদের অন্তরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সময়ের জন্য প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।  ফলে গার্ড ফ্লোরাসমৃদ্ধ হয় আন্ত্রিক রোগবালাই থেকে দূরে থাকা যায়। 

৩. প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার খান ।  দই, লাচ্ছি, ঘোল, মাঠা, লাবাং ইত্যাদিতে প্রচুর প্রোবায়োটিক থাকে।  তাই এগুলো মিস করবেন না।  তবে আপনার ল্যাক্টোজইনটলারেন্স থাকলে এগুলো পরিহার করতে হবে। 

৪. মাংস খেলে গ্রিল মাংস খান।  অতিরিক্ত তৈলাক্ত মাংসের পরিবর্তে গ্রিল বা সিদ্ধ মাংস খান পরিমিত পরিমাণে।  অতিরিক্ত মাংস কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে। 

৫. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।  কার্বনেটেড সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন।  এগুলো গ্যাস ও পেট ফাঁপার জন্য দায়ী।  পরিমিত তাজা ফলের রস ও গ্রিন টি খেতে পারেন। 

৬. মিষ্টি কম খান।  শিরনি, পায়েস, ফালুদা খাবেন।  তবে অতিরিক্ত খাবেন না।  ডায়াবেটিস রোগীরা কৃত্রিম মিষ্টি কারক ব্যবহার করতে পারেন। 

৭. সুস্বাদু খাবারের আয়োজনে লবণের আধিক্য থাকে।  টেস্টিং সল্ট ব্যবহার হয়, লবণাক্ত সিফট এড়িয়ে চলুন।  খেলে পরিমিত খান।  এগুলো উচ্চ রক্তচাপ ও বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। 

৮. হালকা শরীরচর্চা করুন।  যেমন হাঁটাহাঁটি, যা পরিপাক প্রক্রিয়াকে সচল ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। 

এগুলো ছাড়াও রোজার মাসে খেজুর, বাদাম, কিশমিশ ইত্যাদি খাওয়ার অভ্যাস করে থাকলে ঈদ ও তার পরবর্তী সময় অভ্যাসটি জারি রাখুন।  এগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ জরুরি মাইক্রো মিনারেল ফাইবার ও এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকে।  পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর, সুষম ও পরিমিত খাবার হোক আপনার ঈদ উদ্‌যাপনের সঙ্গী।  পরিমিত পানাহার শুধু স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়, এটি আল্লাহর নেয়ামতের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়ও বটে।  সবার জন্য সুস্থ সুন্দর খুশির ঈদ কামনায় ঈদ মোবারক। 

লেখক : গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


keya